logo

সাহসী ট্যামির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

সাহসী ট্যামির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে ট্যামি সন্ডার্স যখন নিজের চেহারার একটা অংশ হারিয়ে ফেলেন, তখন হারানো চেহারার সঙ্গে তার আত্মবিশ্বাসটাও হারিয়ে ফেলেন তিনি। অত্যন্ত কঠিন আর দুর্বিষহ সময় পার করে কীভাবে আবার জীবনের কক্ষপথে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছেন, সে সফলতার গল্পই লিখেছেন তিনি। তার এ সাফল্যগাথা প্রকাশ করেছে বিবিসি।

লেখার শুরুতেই ট্যামি লিখেছেন, ‘আমি মনে করি না, পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ আছে যিনি শতভাগ আত্মবিশ্বাসী। আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিত্বে এমন কিছু না কিছু অাছে, যার কারণে আমরা অনেক সময় দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগি।’

অন্যান্য মেয়েদের তুলনায় ট্যামির শিশু ও কৈশোর বরং বেশি দুর্দান্ত ও সাফল্যমণ্ডিত ছিল। টিনএজ অবশ্য কেটেছে উদ্বেগের মধ্যেই। টিনএজের মাঝামাঝি সময়ে টের পেতে শুরু করেন, চামড়া, চুল ও শরীরের অন্যান্য অংশে পরিবর্তন হচ্ছে। এমন-কি এক পর্যায়ে জনসম্মুখে যাওয়া যথাসম্ভব এড়াতে শুরু করলেন ট্যামি। তবে সেটা ততটা ভয়াবহ ছিল না, বাহির থেকে বোঝাও যেত না। মেয়ে জনসম্মুখে যেতে ভয় পাচ্ছে দেখে কিছু একটাতে নিজেকে ব্যস্ত রাখার তাগিদ দিলেন মা। অনেকটা মায়ের জোরাজুরিতেই স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে চাকরি নেন ট্যামি।

চাকরির প্রথম দিকে একটু দ্বিধা কাজ করেলও সাফল্য পেতে বেশি দেরি হলো না।  মাত্র কয়েকদিনের মাথায় সেরা কর্মীর স্বীকৃতি পেলেন। রেস্টুরেন্টের মালিক থেকে শুরু করে ক্রেতারা পর্যন্ত ট্যামির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মাত্র বিশ বছর বয়সেই গাড়ি, বাড়ির মালিক হয়ে গেলেন। মনের মতো একজন প্রেমিকের খোঁজও পেয়ে গেলেন। মাসকারা-লিপস্টিক পরলে অনেকটা পরীর মতো মনে হতো তাকে। এই প্রথম নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ হলো ট্যামির। কিন্তু এ সুখ আর সাফল্য বেশিদিন স্থায়ী হলো না । ৩২ বছর বয়সে হঠাৎ করেই তার জীবন উথালপাথাল হয়ে গেল।

ট্যামির বর্ণনা ছিল এরকম
২০১৩ সালের ক্রিসমাসটা আমার কাছে অন্যান্য বছরের মতোই ছিল। ক্রিসমাসের ছুটি কাটাতে মায়ের কাছে গেলাম। সেখান থেকে ২৭ তারিখ আমার বোন ও তার পরিবারের সাথে দেখা করতে লন্ডনে যাওয়ার কথা আমার। কিন্তু ওই দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ‘শরীর ভালো না থাকায়’ আমার লন্ডন যাওয়ার পরিকল্পনা পরের দিন পর্যন্ত স্থগিত করা হলো। কিন্তু পরের দিন লন্ডনে নয়, আমার স্থান হলো স্থানীয় হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে।

নিজের ভেতর কিছু একটা যে হচ্ছে, সেটা ২৭ তারিখ সকাল থেকেই টের পাচ্ছিলাম। সেটা পুরোপুরি বুঝতে পারলাম যখন সামান্য পানি খেয়ে সাথে সাথে বমি করে দিলাম। তারপরও এটিকে সামান্য অসুখ মনে করে তেমন একটা পাত্তা দিলাম না।


কিন্তু হঠাৎই যখন আমার পা এবং ঠোঁটের অনুভূতিশক্তি হারিয়ে ফেলি, তখন আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। আমার শরীরের বিভিন্ন প্রান্তগুলো যেমন পা, হাত, ঠোঁটে খুব ঠান্ডা হতে লাগল এবং আমি সেগুলোকে গরম রাখার যথাসম্ভব চেষ্টা করলাম। পরিস্থিতি নাজুক মনে হওয়ায় আমি দৌড়ে মায়ের রুমে গেলাম। মা আমাকে দেখেই চিৎকার করে উঠলেন, দ্রুতগতিতে আমার বাবাকে দিয়ে এম্বুলেন্স ডাকালেন। দুই ঘণ্টা পর দেখলাম সারা শরীরে তার, বিভিন্ন মেশিন ও মনিটর দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।

আমার meningococcal septicaemia হয়েছিল। এটা এক ধরনের মেনিনজাইটিস যেটি রক্তকে দূষিত করার জন্য দায়ী। ডাক্তাররা প্রায় দশ দিন আপ্রাণ চেষ্টা করে আমার রোগটি ধরতে পেরেছিল। আমার ডিসেমিনেটেড ইনট্রাভাসকুলার কোয়াগুলেশনও (ডিআইসি) ধরা পড়েছিল, যেটি মেনিনজাইটিসের আরেকটি ভয়াবহ মাত্রা।

ডিআইসির কারণে আমার রক্তনালীর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল এবং বিভিন্ন জায়গায় রক্তনালি ছিঁড়ে গিয়ে চামড়ার নিচ দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হতো। এই সময় আমার শরীরের প্রান্তগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং সেগুলোতে পচন ধরে। বিশেষ করে মুখ এবং হাতে। আমার নাকের অর্ধেকের বেশি আর ঠোঁট প্রায় পুরোটাই পঁচে যায়। পা, হাত, বাহুর (কবজির উপরের অংশ) অনেক মাংস কেটে ফেলে দিতে হলো। হাতের যেসব চামড়া তখন পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিল, সেগুলোতে পোড়া দাগের মতো হয়ে গিয়েছিল। হাত-পায়ের অধিকাংশ পেশী নষ্ট হয়ে যাওয়ায় চলাফেরা করতে অক্ষম হয়ে গেলাম, একই সাথে আমার হাতগুলোও অকেজো হয়ে গেল।


টিনএজের পর আবারো নিজের চেহারা এবং শরীর দেখে কষ্ট পেলাম। কিন্তু এখনকার অবস্থাটা টিনএজের চেয়ে বহুগুন খারাপ। সুস্থ হতে প্রায় চারমাস সময় লেগে যায়। তবে আজীবনের জন্য ‘অদ্ভুত চেহারা’ বরণ করে নিতে হলো আমাকে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও জীবনে আমূল পরিবর্তন আসলো আমার। বাইরে বা জনসম্মুখে কেউ যেন আমাকে দেখে চমকে না যায়, সেজন্য সার্বক্ষণিক সচেতন থাকা শুরু করলাম। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে আমি ছিলাম খুবই কর্মঠ এবং সামাজিক। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর সারাক্ষণ অবরুদ্ধ বাসায়ই সময় কাটাতাম। কারণ আমি অন্য দশজন হাসপাতাল ফেরতদের মতো নই।
নিজের বর্তমান অবস্থা দেখে আমি খুবই ভেঙে পড়লাম। আমার মনে হচ্ছিল সেই আগের দুর্বার, কর্মোদ্দীপ্ত ট্যামি মারা গেছে। তার জায়গায় এখন যে আছে, তাকে আমি চিনতেই পারছিলাম না। আমি ভেঙে পড়ি। কিন্তু যখন আমার মনের দুরবস্থার কথা পরিবার ও বন্ধুদের বলতাম, তারা অবাক হতো। আমাকে উৎসাহ দিত এবং বলত, আমি তাদের কাছে এখনও আগের মতোই অাছি। বরং তারা আমাকে একটি ভয়ঙ্কর জীবনযুদ্ধে বিজয়ী বীর হিসেবে আখ্যায়িত করত। এসব আমার মুখে হাসি ফুটাত, আমি ভালো অনুভব করতাম।


নিজের প্রেমিকের খোঁজ পেয়েছেন ট্যামি

‘অনুপ্রেরণাদায়ী’, ‘শক্তিশালী’ এসব শব্দ আগের মতো এখনও আমাকে বিব্রত করে। কিন্তু আমি ভাবতে শুরু করেছি- যেসব মানুষ আমাকে তাদের প্রেরণার উৎস ভাবে, তাদের ধারণা সঠিক প্রমাণ করতে হবে। আমার অসুখের আগে আমি ঠিক যেমন ছিলাম, এখনও আমি তেমনই অাছি এবং আমার হতাশ হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি।

এ কারণেই আমি চ্যানেল ফোর’র ‘দ্য আনডেটেবলস’ অনুষ্ঠানে আবেদন করি। এ অনুষ্ঠানটি শারীরীকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের প্রেমের অনুষ্ঠান। আমি মনে করি, আমি সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় মৃত্যুকে পরাজিত করতে পেরেছি। তাই আমার পক্ষে আর কোনো কিছু অসম্ভব নয়।  আমি আমার সেই আগের দিনগুলো ফেরত পেতে চেয়েছি।

অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়াটা আমার দারুণ কাজে দিয়েছে। একটা দুঃসহ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে যে পরিবেশটা আমার দরকার ছিল, এ অনুষ্ঠান আমাকে সেটি দিয়েছে। এখানে সবাই অসাধারণ, সবাই আমার খারাপ চেহারাটার কথা ভুলে গিয়ে আমার ভালো দিকগুলোর কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এখানে আমি আমার দুঃসহ সেসব দিনের কথা আবেগতাড়িত হওয়া ছাড়াই বলতে পারছি। সবাই আমার সে গল্প শুনে আমাকে উৎসাহ দিচ্ছে, আমার প্রশংসা করছে।


‘দ্য আনডেটেবলস’ অনুষ্ঠানে ট্যামির উপস্থিতির প্রসংশা করেছেন অনেকেই 

এখানে আমার প্রেমিকও খুঁজে পেয়েছি। এটি আমার জন্য একটি অন্যরকম মুহূর্ত। তার সাথে দেখা হওয়ার অাগে আমি অনেক নার্ভাস ছিলাম। কিন্তু তার সাথে দেখা হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। সে আমার মুখের দাগগুলোর পরিবর্তে চোখের দিকে তাকাচ্ছিল এবং আমার চেহারা দেখে নয়, বরং আমার ব্যাক্তিত্বের জন্যই আমাকে পছন্দ করল। এটা প্রমাণ করে যে, আমার যাই হোক না কেন, আমি এখনও অনেকের কাছে আকর্ষণীয়।

এ অনুষ্ঠানটির শ্যুটিংয়ের সময় আমি আরও তিনবার সে হাসপাতালে গিয়েছি এবং প্রতিবারই নতুন বন্ধু তৈরি করেছি। আমার এমন কিছুর বন্ধুর দেখা পেয়েছি, যারা অপারেশনের পর প্রথম প্রথম আমাকে দেখে চমকে যেত। অথচ এখন তাদের আচরণ খুব স্বাভাবিক এবং আগের মতোই বন্ধুসুলভ। প্রত্যেকেই আমাকে ভালো ভালো কথা বলল, আমার সেরে উঠার বিষয়ে খোঁজ-খবর নিল। আমার হারানো আত্মবিশ্বাস পুনরায় ফিরে পেতে এসব ঘটনা খুবই সাহায্য করেছে। 

আমাকে প্রায়ই বলা হয়, মানুষ আমাকে নিয়ে কী ভাবে, তাতে যেন আমি কর্নপাত না করি। কিন্তু আমি সত্যিই মানুষের কথায় কান দেই, যখন কেউ আমাকে নিয়ে গর্ববোধ করে কিংবা আমার জীবনযুদ্ধ থেকে প্রেরণা নেওয়ার কথা বলে। আমাকে প্রচুর মানুষের কটু কথা শুনতে হয়, হচ্ছে। আমাকে নিয়ে অনেকেই কানাঘুষা করে। কিন্তু আমি এখন জানি, বুঝতে শিখেছি যে তারা ভুল।