logo

বিকাশের প্রতারণার জালে অসহায় গ্রাহক

বিকাশের প্রতারণার জালে অসহায় গ্রাহক

ঢাকা, ০২ জানুয়ারী- মোবাইল ফোনের সাহায্যে টাকা আদান প্রদানের মাধ্যম ‘বিকাশ’ এ ছড়িয়ে পড়েছে নানা প্রতারণার জাল। সারা দেশে প্রতিনিয়ত অসংখ্য গ্রাহক নানা প্রতারণার শিকার হলেও প্রতিকারে এগিয়ে আসছে না সংশ্লিষ্ট কেউই। প্রতারণার শিকার গ্রাহকদের ‘অজ্ঞতা’র কালিমা দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব কৌশলে এড়িয়ে যায় বিকাশ কর্তৃপক্ষ। অপরদিকে এ বিষয়ে পুলিশের কাছে নালিশ করে সহসাই কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা।

গত মঙ্গলবার (২৯ ডিসেম্বর) অভিনব এক প্রতারণার শিকার হয়েছেন মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা কবির হোসেন। পেশায় ব্যবসায়ী কবিরের মোবাইলে ওইদিন সন্ধ্যায় তার এক গ্রাহক বগুড়া থেকে ১০ হাজার টাকা পাঠান। এর কিছুক্ষণ পর তার মোবাইলে একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। ভুলে কিছু টাকা কবিরের মোবাইলে চলে গেছে জানিয়ে ওই ব্যক্তি টাকাগুলো ফেরত চান কবিরের কাছে। কিন্তু কবির কোনো এসএমস না পাওয়ার কথা জানালে ওই ব্যক্তি বলেন, নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে হয়ত এসএমএস যায়নি, ব্যালেন্স চেক করলেই আপনি টাকা দেখতে পাবেন। এরপর কবির তার ব্যালেন্স চেক করে একাউন্টে ৩৫ হাজার টাকা দেখতে পান এবং কিছুক্ষণ পর এসএমএসও পান। এরপর ওই ব্যক্তির কথামতো তাকে ১০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন।

টাকা পাঠানোর পর কবির দেখতে পান তার বিকাশ একাউন্ট থেকে ১০ হাজার টাকা কাটার পরিবর্তে কেটে নেয়া হয়েছে ২০ হাজার টাকা। যার ফলশ্রতিতে তার একাউন্টে টাকার পরিমাণ অবশিষ্ট থাকে ১৪ হাজার টাকার কিছু বেশি।

এরপর কবিরকে ০১৮৫৫৫৫৫০২৩ নম্বর থেকে এক ব্যক্তি ফোন করে বিকাশের এজেন্ট পরিচয় দিয়ে বলেন, তিনি (কবির) যদি আরো ১০ হাজার টাকা ওই নম্বরে পাঠিয়ে দেন তবে পুরো টাকাটাই (৩৫ হাজার) তার একাউন্টে জমা হয়ে যাবে। কিন্তু কবির আর সেটা না করে পুলিশের আশ্রয় নেন।

মঙ্গলবার রাতেই মোহাম্মদপুর থানায় তিনি অভিযোগ জানিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। ডায়েরি নং ২১৯৭, তারিখ ২৯.১২.২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ। পাশাপাশি চেষ্টা করেছিলেন বিকাশের সহায়তা নেয়ার। কিন্তু পরদিন বুধবার মহাখালীর গ্রাহক সেবা কেন্দ্রে গেলে সেখানে কর্মরত ব্যক্তিরা তাকে কোনো ধরণের সহায়তা না করে পুলিশে অভিযোগ করার পরামর্শ দেন।

এ বিষয়ে আরো কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হয়। তারা বিকাশের কাস্টমার কেয়ারে গিয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয় বলে জানান। তাদের মতে, বিকাশ কাস্টমার কেয়ারে গেলে তারা সমস্যার সমাধানে সহায়তা করেন না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্রাহকদের উপর ‘অজ্ঞতা’র কালিমা লেপন করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জাকারিয়া স্বপন বলেন, ‘মোবাইলে বিকাশের নাম ব্যবহার করে মাস্কিং এসএমএস যেটাকে বলা হয় সেটা দেয়া সম্ভব। কিন্তু মূল একাউন্টে টাকা দেখাতে হলে তাতে বিকাশের কোনো কর্মকর্তাকে অবশ্যই জড়িত থাকতে হবে। বিকাশের সিস্টেমে এক্সেস ছাড়া কোনোভাবেই এটা সম্ভব নয়।’

গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা গেছে, প্রতারণামূলক যত ফোন আসে সবগুলোতে রবি নম্বর ব্যবহার করা হয়। গ্রাহকদের প্রশ্ন রবি নম্বর ব্যবহার করে সিম ক্লোনিং করা সহজ কি-না?

এ প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় রবির মুখপাত্র ইকরাম কবীরের সঙ্গে। বিকাশে প্রতারণার ঘটনায় রবিকে না জড়ানোর অনুরোধ করে তিনি বলেন, ‘সিম ক্লোনিংয়ে রবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। প্রতারকরা তাদের প্রতারণার জন্য যে কোনো অপারেটরকেই বেঁছে নিতে পারে। এ জন্য দোষটা কখনোই অপারেটরের না। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ হবে প্রতারক চক্রটিকে খুঁজে বের করা এবং দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসা।’

এক গ্রাহক প্রতারণার শিকার হয়েছেন দাবি করে বিকাশের পিআর এন্ড মিডিয়া বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, গ্রাহকদের সতকর্তার জন্য তারা বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্পেইনের আয়োজন করেন। কিন্তু কখন, কিভাবে এবং কোথায় ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হয় সে সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু বলতে পারেননি জাহিদুল।

বিকাশের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বিকাশের কোনো কর্মকর্তা এ ধরণের প্রতারণায় জড়িত থাকলে সেটা বিকাশ থেকে জানা সম্ভব। কিন্তু এখনো কোনো কর্মকর্তার প্রতারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

প্রতারকরা কীভাবে গ্রাহকের ব্যালেন্স জানতে পারেন? এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান জাহিদুল।

প্রতারণার শিকার গ্রাহকদের অসহযোগিতার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বিকাশ গ্রাহক এবং পুলিশকে সম্পূর্ণভাবে সহায়তা করে। আর কবির হোসেনের ক্ষেত্রে বিষয়টা কি হয়েছে সে বিষয়ে তিনি খোঁজ খবর নিবেন বলে জানান।

কবির হোসেনের ডায়রির তদন্তের বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাসুদুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কবির হোসেনের টাকা যেহেতু বগুড়া থেকে এসেছে তাই তাকে আমি বগুড়া থানায় একটি জিডি করার পরামর্শ দিয়েছি।

এই পরামর্শের কারণ জানতে চাইলে মাসুদুর বলেন, আমাদের পক্ষে একটা জিডির জন্য বগুড়া থানায় গিয়ে তদন্ত করা কষ্টকর। তাই আমি তাকে বগুড়ায় জিডি করার পরামর্শ দিয়েছি।