logo

ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

ঢাকা, ০২ জানুয়ারি- ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশের পাশাপাশি ভিক্ষুক ও ছিন্নমূল মানুষদের সরকারের তরফ থেকে বিনাখরচে পুনর্বাসনের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শনিবার জাতীয় সমাজসেবা দিবস ও সমাজসেবা সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে সরকারের ‘ঘরে ফেরা কর্মসূচি’, ‘আশ্রয়ন প্রকল্প’, প্রশিক্ষণ ও ঋণ দেওয়াসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।

শেখ হাসিনা বলেন, “আমি বিশেষভাবে বলব, এই ভিক্ষাবৃত্তি যেন কেউ করতে না পারে। ভিক্ষাবৃত্তিটা যেন কোনো কোনো লোকের পেশায় দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের আবার সর্দার থাকে। যা পায় তারা আবার ভাগ বাটোয়ারা করে। যতই পুনর্বাসন করি না কেন, আবার তাদের ফেরত নিয়ে আসে।”

তিনি বলেন, “ইতিমধ্যে ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনের জন্য আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। বিনা পয়সায় ঘর দিচ্ছি। ট্রেনিং দিচ্ছি। তাদের ঋণ দিচ্ছি। যেন নিজের পায়ে তারা দাঁড়াতে পারে।

“তাদের ঘর-বাড়ি লাগলে, বিনা পয়সায় আমরা ঘর-বাড়ি করে দেব। জীবন-জীবিকার জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা আমরা করে দেব। এই ধরনের হীন কাজ তারা করতে পারবে না। সে ব্যবস্থা আমাদের নিতে হবে।” গৃহহীনদের বিনা খরচে বাসস্থান করে দেওয়ার কথাও মনে করিয়ে দেন সরকারপ্রধান।

“মানুষ ফুটপাতে ঘরবাড়ি করে থাকে। শীতের সময় রেলস্টেশনে ফুটপাতে, এখানে সেখানে পড়ে থাকে, বা এমনিই ওখানে থাকবে। আমার নির্দেশ আছে, যখনই এধরনের পরিবার দেখবেন বা কাউকে দেখবেন, সাথে সাথে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবেন।”

“কে কোন গ্রাম থেকে এসেছে, তাদের সেখানে ঘর না থাকলে বিনা পয়সায় ঘর করে দেব, তাদের ঋণ দেব এবং দরকার হলে তাকে প্রথম ছয় মাস বিনা পয়সায় খাদ্য সামগ্রী দেব। যেন নিজের পায়ে দাঁড়ানো, নিজে কাজ করতে পারে।”

দেশের প্রতিটি নাগরিকের কর্মস্থান নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “যে যেভাবে পারে, কাজ করে খাবে। বাংলাদেশ তখনই উন্নত সমৃদ্ধ হবে, যখন সমাজের সর্বস্তরের মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে।”

দারিদ্র বিমোচনে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এদেশে কোনো মানুষ একেবারে গরিব থাকবে না। প্রত্যেকটি মানুষের জীবনমান যেন উন্নত হয়, সে লক্ষ্য নিয়েই কিন্তু আমাদের সরকার কাজ করে যাচ্ছে।”

একেবারে হতদরিদ্র এবং সমাজের নিম্নস্তরে পড়ে থাকা নাগরিকদের উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন শেখ হাসিনা। “বাংলাদেশ দরিদ্র থাকবে না, উন্নত হবে, সমৃদ্ধশালী হবে। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।” সমাজসেবাকে প্রতিটি রাজনীতিকের দায়িত্ব হিসাবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা যে রাজনীতিটা করি, তার মূল লক্ষ্যটাই সমাজের সেবা করা।

“১৯৭২ সালের ১০ জানুয়রি দেশে ফিরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের একমাত্র কামনা, বাংলাদেশের মানুষ যেন তাদের খাদ্য পায়, আশ্রয় পায়, উন্নত জীবনের অধিকারী হয়’। জাতির পিতার সারা জীবনের রাজনীতির এটাই ছিল লক্ষ্য, বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা।”

জাতীয় সমাজসেবা দিবস ২০১৬ ও সমাজসেবা সপ্তাহের এবারের প্রতিপাদ্য ‘সমাজসেবার প্রচেষ্টা এগিয়ে যাবে দেশটা’। এই প্রতিপাদ্যকে অত্যন্ত যুগোপযোগী উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “আমি মনে করি, আমাদের সমাজের সর্বস্তরের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি যদি আমরা করতে না পারি, তাহলে দেশটা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে না। “বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত হিসাবে গড়ে তুলতে হবে এবং এই উন্নয়নের ধারা সমাজের সকলের কাছে পৌঁছে দিতে হবে”

প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার প্রায় ৩০ লাখ বয়স্ককে প্রতি মাসে ৪০০ টাকা করে ভাতা দিচ্ছে। এছাড়া ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, দুঃস্থ ১১ লাখ ১৩ হাজার ২১৫ জনকে ৪০০ টাকা করে ভাতা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। “এক হাজার ৪৪০ কোটি টাকা আমরা ভাতা হিসাবে বিতরণ করছি,” বলেন শেখ হাসিনা।  

দেশে প্রতিবন্ধীদের সঠিক হিসাব না থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রতিবন্ধীদের আসলে কখনো কোনো হিসাব করা হয়নি। ১৪ লাখ প্রতিবন্ধী আছে বলে হিসাব পাওয়া গেছে।” ছয় লাখ প্রতিবন্ধীকে মাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে ১৩ হাজার শিক্ষার্থীকে ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে ১০০ প্রতিবন্ধীও রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

এতিমদের দায়িত্ব সরকারের উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা সরকারে এসেছি, মানুষের সেবা করতে, সমাজের সেবা করতে। এতিমদের টাকা চুরি করে খাওয়ার জন্য আসি নাই বা এতিমদের টাকা মেরে খাওয়ার জন্য আসি নাই। আমরা এতিমদের দিতে এসেছি।

“কারণ, আমরা নিজেরাও তো বাবা-মা হারিয়ে এতিম হয়েছি। এতিম হওয়ার কষ্ট আমি আর রেহানা ছাড়া আর কেউ বেশি জানে না। এদেশের কোনো মানুষ এতিম থাকবে না। তাদের দায়িত্ব আমরা নিয়েছি। আওয়ামী লীগ সরকার নিয়েছে। আমি নিয়েছি।” শিশুদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো বন্ধে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্রেইল পাঠ্যপুস্তক এবং সরকারি শিশু পরিবারের কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।

এছাড়া সরকারি শিশু পরিবার থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে এখন পুলিশে কর্মরত একজন নারী ও পুরুষ কনস্টেবলকে সফল সদস্য হিসাবে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব তরিকুল ইসলাম। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ নূরুল কবির। পরে প্রধানমন্ত্রী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।