logo

তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমার প্রস্তুতি

আবুল হাসান


তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমার প্রস্তুতি

ঢাকা, ০২ জানুয়ারি- রাজধানী ঢাকার কাছে টঙ্গীতে তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমার ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে এখন পুরোদমে। পবিত্র হজের পর মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ ধর্মীয় সমাবেশে দেশ-বিদেশের লাখো লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লি অংশ নেবেন। 

এবারের দু’পর্বের ছয়দিনের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের তিনদিনের ইজতেমা শুরু হবে আগামী ৮ জানুয়ারি। আর দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমা শুরু হবে ১৫ জানুয়ারি। দু’পর্বেই পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত হবে আখেরি মোনাজাত। প্রথম পর্বের ১০ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় পর্বের ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে আখেরি মোনাজাত। 

প্রথম পর্বের তিনদিনের ইজতেমায় বয়ান ও আখেরি মোনাজাত শেষ হওয়ার পর ইজতেমা ময়দানে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা অপসারণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি এ চারদিনের বিরতি থাকবে। 

এবারের ৫০তম বিশ্ব ইজতেমার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে ইতোমধ্যে ইজতেমা ময়দানে বিশাল প্যান্ডেল নির্মাণের জন্য বাঁশের খুঁটি পুতে চটের ছাউনি দেয়া হয়েছে। এবারের দু’পর্বের বিশ্ব ইজতেমা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে আগামী ৪ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশের আইজি একেএম শহীদুল হক পিপিএম সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শনে আসবেন বলে জানিয়েছেন গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ পিপিএম (বার)।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে ইজতমো ময়দান সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, টঙ্গীর তুরাগের তীরে আসন্ন বিশ্ব ইজতেমাকে ঘিরে ইজতেমা ময়দানের চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। আর এ প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে ঢাকার কাকরাইলসহ বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাড়াও তাবলিগের কাজে নিয়োজিত মুসল্লিরা ময়দানের প্যান্ডেল নির্মাণসহ অন্যান্য কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। প্রায় ৫ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিশাল প্যান্ডেল নির্মাণসহ অন্যান্য আনুসাঙ্গিক কাজ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে করা হচ্ছে। 

ইজতেমার আয়োজক ও মাঠের প্রস্তুতি কাজে অংশ নেয়া বেশ কয়েকজন মুসল্লি জানান, ১৬০ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত ইজতেমা ময়দানে বাঁশ ও চটের তৈরি সামিয়ানা টানাতে প্রতিদিন তাবলিগের ৩-৪শ স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। তারা বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে দলবেঁধে এসে স্বেচ্ছায় এ কাজে অংশ নিচ্ছেন। 

তাবলিগ জামাতের মুরব্বিদের নির্দেশনায় দলভুক্ত হয়ে কেউ কেউ প্যান্ডেলের চট টাঙাচ্ছেন, কেউ খুঁটি পুঁতছেন, কেউ মাঠ সমতল ও নামাজের জন্য জায়গা নির্ধারণ ও বয়ান মঞ্চে শীর্ষ মুরুব্বিদের যাতায়াতের  জন্য অস্থায়ী স্টিলের ব্রিজ নির্মাণসহ মাঠ পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। প্রতিদিন সব মিলিয়ে ৪-৫ হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ইজতেমার প্যান্ডেল তৈরিসহ পুরো ময়দানের নানা কাজে শরিক হচ্ছেন। 

আগামী ৪-৫ দিনের মধ্যে ইজতেমার সকল প্রস্তুতি কাজ সম্পন্ন করা যাবে বলে আশা করছেন ইজতেমার আয়োজকরা। ইতোমধ্যে ৯০ ভাগ প্রস্তুতি কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ব ইজতেমা মাঠের দায়িত্বে নিয়োজিত অন্যতম জিম্মাদার গিয়াস উদ্দিন আহমেদ।

গত বছরের মতো এবারও ইজতেমা মাঠের উত্তর-পশ্চিমাংশে বিদেশি মেহমানদের জন্য টিনের ছাউনির পৃথক কামরা তৈরির কাজও চলছে দ্রুত গতিতে। অনুকুল আবহাওয়া বিদ্যমান থাকলে গতবারের চেয়ে এবার বেশি সংখ্যক মুসল্লি আগমনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে আয়োজকরা ধারণা করছেন। 

এবারের ইজতেমায় নির্বিঘ্নে চলাচল, ওজু-গোসল ও প্রাতঃক্রিয়া সম্পন্ন এবং তুরাগ নদের পানি দূষণ কমানোর জন্য সরকার ও ইজতেমার আয়োজক কমিটি বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-ময়দানের উত্তরাংশে পানির ট্যাংকের কাছে নতুন করে টয়লেট নির্মাণ, মাঠের অভ্যন্তরে ইট বিছানো, চলাচলের রাস্তার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উৎপাদক নলকূপ নির্মাণ প্রভৃতি। এছাড়া মলমূত্র যাতে তুরাগ নদে না পড়ে সেজন্য বেশ কিছু সেফটিক ট্যাংক নির্মাণ করা হচ্ছে।

দু’পর্বের ইজতেমায় মুসল্লিদের অংশ নেয়ার জন্য বিশাল চটের প্যান্ডেলকে জেলাওয়ারি নির্দিষ্ট খিত্তায় ভাগ করা হয়েছে। এবার প্রথম পর্বের ১৭টি জেলার জন্য পুরো প্যান্ডেলকে ২৭টি খিত্তায় ভাগ করা হয়েছে। এসব খিত্তায় ১ থেকে ৬নং খিত্তায় ঢাকা জেলার, ৭নং খিত্তায় শেরপুর, ৮নং ও ১১নং খিত্তায় নারায়নগঞ্জ, ৯নং খিত্তায় নিলফামারী, ১০নং খিত্তায় সিরাজগঞ্জ, ১২নং খিত্তায় নাটোর, ১৩নং খিত্তায় গাইবান্ধ্যা, ১৪ ও ১৫নং খিত্তায় লক্ষ্মীপুর, ১৬ ও ১৭নং খিত্তায় সিলেট, ১৮ ও ১৯নং খিত্তায় চট্টগ্রাম, ২০নং খিত্তায় নড়াইল, ২১নং খিত্তায় মাদারীপুর, ২২ ও ২৩ নং খিত্তায় ভোলা, ২৪নং খিত্তায় মাগুরা, ২৫নং খিত্তায় পটুয়াখালী, ২৬নং খিত্তায় ঝালকাঠি ও ২৭নং খিত্তায় পঞ্চগড় জেলার মুসল্লিরা অবস্থান নেবেন। 

দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমায় মুসল্লিদের অংশ নেয়ার জন্য জেলাওয়ারি পুরো প্যান্ডেলকে ২৯টি খিত্তায় ভাগ করা হয়েছে। এতে ১৬টি জেলার মুসুল্লিরা অংশ নেবেন। খিত্তা অনুয়ায়ি এসব জেলা গুলো হচ্ছে- ১নং থেকে ৭ নং খিত্তায় ঢাকা জেলার বাকি এলাকা, ৮নং খিত্তায় ঝিনাইদহ, ৯ ও ১১নং খিত্তায় জামালপুর, ১০নং খিত্তায় ফরিদপুর, ১২ ও ১৩নং খিত্তায় নেত্রকানা, ১৪ ও ১৫নং খিত্তায় নরসিংদী, ১৬ ও ১৮নং খিত্তায় কুমিল্লা, ১৭নং খিত্তায় কুড়িগ্রাম, ১৯ ও ২০নং খিত্তায় রাজশাহী, ২১নং খিত্তায় ফেনী, ২২নং খিত্তায় ঠাকুরগাঁও, ২৩নং খিত্তায় সুনামগঞ্জ, ২৪ ও ২৫নং খিত্তায় বগুড়া, ২৬ ও ২৭নং খিত্তায় খুলনা, ২৮নং খিত্তায় চুয়াডাঙ্গা এবং ২৯নং খিত্তায় পিরোজপুর জেলার মুসুল্লিরা অবস্থান নেবেন।

এদিকে, দু’পর্বের বিশ্ব ইজতেমায় রাজধানীসহ ঢাকাসহ মোট ৩৩টি জেলার মুসুল্লিরা অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলেও খোদ গাজীপুরসহ বাকি ৩১টি জেলার মুসুল্লিরা এবারের বিশ্ব ইজতেমায় শামিল হতে পারছেন না। 

এ ব্যাপারে ইজতেমা মাঠে দায়িত্বে নিয়োজিত আয়োজক কমিটির অন্যতম মুরুব্বি গিয়াস উদ্দিন আহমেদ জানান, মাঠে মুসল্লিদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় এবং তাদের অংশ গ্রহণের সুবিধার্থে এবারের বিশ্ব ইজতেমায় ৬৪ জেলার মধ্যে শুধুমাত্র ৩৩টি জেলার মুসল্লিরা অংশ গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। বাকি ৩১টি জেলার মুসুল্লিরা আগামী বছর অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকছে।

তিনি আরো জানান, তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরুব্বিদের পরামর্শক্রমে ইজতেমার প্রস্তুতিকাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। এখানে বিদ্যুৎ, পানি, প্যান্ডেল তৈরি ও গ্যাস সরবরাহ প্রতিটি কাজই আলাদা আলাদা গ্রুপের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে। এছাড়া তুরাগ নদের মুসল্লিদের পারাপারের জন্য সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোরের সদস্যরা ৮টি অস্থায়ী পন্টুন ব্রিজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ পিপিএম (বার) জানান, ইজতেমার মাঠের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানে এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৮ হাজার নিরাপত্তাকর্মী কাজ করবে। পাশাপাশি পুলিশ ও র‌্যাবের সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বিক নিরাপত্তা মনিটরিং করা হবে। নিরাপত্তায় বাইনোকোলার, মেটাল ডিটেকটর, কন্ট্রোল রুমও স্থাপন করা হবে। এছাড়া ইজতেমা মাঠের বিভিন্ন স্থানে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার স্থাপন করা হবে।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এসএম আলম জানান, দু’পর্বের বিশ্ব ইজতেমার সার্বিক কার্যক্রম সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিভাগের কাজের সমন্বয় করা হচ্ছে। এজন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলাদা কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হবে।

এছাড়া ইজতেমা সফল করার লক্ষ্যে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও নেয়া হয়েছে নানা ব্যবস্থা।