logo

বাংলাদেশ হবে তৃতীয় শীর্ষ প্রবৃদ্ধির দেশ

শওকত হোসেন


বাংলাদেশ হবে তৃতীয় শীর্ষ প্রবৃদ্ধির দেশ

ঢাকা, ০১ জানুয়ারী- নতুন বছরে অর্থনীতি নিয়ে আছে অনেক প্রত্যাশা। কিন্তু রাজনীতিতে আছে নানা শঙ্কা। সবাই মানেন যে রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা থাকলে আরও এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। তাই নতুন বছরের আকাঙ্ক্ষা—রাজনীতির গুমোট ভাব কাটবে, অর্থনীতি আরও এগিয়ে যাবে। বাড়ুক গণতন্ত্রের চর্চা, কেটে যাক জঙ্গিবাদের হুমকি। সুস্থ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সমৃদ্ধি বাড়ুক বাংলাদেশের।

নতুন বছরটি শুরু হোক শুভ সংবাদ দিয়ে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম প্রবৃদ্ধির দেশ। এই বছরটিতে বাংলাদেশ ছাড়িয়ে যাবে চীনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হারকেও।

নতুন বছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এর চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হবে কেবল ইরাক ও ভারতের। এর মধ্যে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে ইরাক থাকবে তালিকার শীর্ষে। ভারতের প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

জাতিসংঘ ও বহুজাতিক দাতা সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বছর শেষে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিয়ে প্রাক্কলন প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। এবারও করেছে। সেখানে প্রতিটি দেশ নিয়েও প্রাক্কলন রয়েছে। এর মধ্যে মূলত আইএমএফের দেওয়া তথ্য ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন মানি প্রবৃদ্ধি ও আকারের দিক থেকে শীর্ষ ১০টি দেশের একটি তালিকা তৈরি করেছে। সেই তালিকায় তৃতীয় স্থানেই আছে বাংলাদেশ।

আইএমএফ বলছে, ২০১৬ সালে বিশ্বমন্দা আরও গভীর হবে। গত অক্টোবরে তারা বলেছিল, নতুন বছরে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু এখন মনে করা হচ্ছে প্রবৃদ্ধি আরও কম হবে। জাতিসংঘ প্রতি নতুন বছরের শুরুতে অর্থনীতির আরেকটি প্রাক্কলন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এবারের প্রতিবেদনের একটি সারাংশ গত সপ্তাহে প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ৯ শতাংশ।

বিশ্ব অর্থনীতির এ রকম এক হতাশাজনক প্রেক্ষাপটে নতুন বছরে বাংলাদেশ নিয়ে সবাই সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে। ডিসেম্বরে বাংলাদেশে এসেছিলেন বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু। তিনিও বাংলাদেশের সাড়ে ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রশংসা করে এ জন্য বাংলাদেশের নাগরিকদের গর্বিত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বাংলাদেশ পাল্লা দেবে, এটা কয়েক বছর আগেও ভাবা যেত না।

সিএনএনের তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে চীনকেও। তালিকায় ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ছিল পঞ্চম স্থানে। আর প্রবৃদ্ধি হবে বলে প্রাক্কলন ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৬ সালে এসে বাংলাদেশ দুই ধাপ এগিয়ে তৃতীয় স্থান দখল করেছে। তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলো হচ্ছে যথাক্রমে কাতার (৬.৫%), চীন (৬.৩%), ফিলিপাইন (৬.৩%), ভিয়েতনাম (৫.৮%), ইন্দোনেশিয়া (৫.৫%), মেক্সিকো (৫.৫%) এবং নাইজেরিয়া (৫%)।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম বলেন, ‘আইএমএফ বলছে, ৬ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে; বিশ্বব্যাংক বলছে সাড়ে ৬ শতাংশ। এরা সব সময়ই রক্ষণশীল হিসাব দেয়। প্রতিবছরই আমরা তাদের প্রাক্কলনের চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করি। এমন কোনো বছর পাওয়া যাবে না, তাদের প্রাক্কলনের চেয়ে কম প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতা না হলে আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, এ বছর প্রথমবারের মতো ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। এটাই ২০১৬ সালের বড় সুখবর।’

তবে এ অর্জনের পেছনে বিনিয়োগকেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করেন শামসুল আলম। তিনি বলেন, জমির প্রাপ্যতা, সুদের হারের পাশাপাশি ব্যক্তি পুঁজির নিরাপত্তার বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। যেখানে (বাংলাদেশ) ব্যাংকে টাকা ফেলে রাখলে ১০-১১ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়, সেখান থেকে কেন প্রায় শূন্য সুদের দেশে টাকা পাচার হয়?
তবে এতটা আশাবাদী নন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, অর্থনীতি এখন কোন কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেটা বিবেচনায় আনতে হবে। এখনো বেশ কিছু সূচকে দুর্বলতা রয়েছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধির যে হার, তাতে এ বছর সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য অর্জিত হবে না। প্রবাসী-আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি। অদূর ভবিষ্যতে প্রবাসী-আয় প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না। কেননা, তেলের দাম কমে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সমস্যায় রয়েছে। আবার পশ্চিমা দেশগুলো অভিবাসীদের সম্পর্কে কঠোর মনোভাব দেখাচ্ছে।

মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, বিনিয়োগই হলো প্রবৃদ্ধির বড় নায়ক। কিন্তু এখন পর্যন্ত ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের প্রাণবন্ত চিত্র দেখা যাচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সংশয় থাকলেও বাংলাদেশের জন্য কিন্তু আরও শুভ সংবাদ দিয়েছে সিএনএন মানি। তারা আগামী ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশগুলোর সম্ভাব্য অবস্থান নিয়েও তালিকা করেছে। সেখানেও বাংলাদেশ আছে ওপরের দিকেই। যেমন, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থাকবে তৃতীয় অবস্থানেই (৭%), পরের দুই বছরে চতুর্থ স্থানে (৭%)। ২০২০ সালে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশ থাকবে চতুর্থ স্থানে। এই সময়ের মধ্যে প্রবৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যাবে মিয়ানমার। মূলত ১০০ বিলিয়ন (১০ হাজার কোটি) ডলারের বেশি অর্থনীতির আকার এমন দেশগুলো নিয়েই তালিকাটি করা হয়েছে।

সিএনএন মানি আরেকটি তালিকা করেছে অর্থনীতির আকারের দিক থেকে। সেখানে অবশ্য পাত্তা পায়নি ছয় মাস আগে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া বাংলাদেশ। এই তালিকায় ১৯ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি নিয়ে সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ হিসেবে আছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপরেই আছে ১২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি চীন। পরের দেশগুলো যথাক্রমে জাপান (৪.৩ ট্রিলিয়ন ডলার), জার্মানি (৩.৫ ট্রিলিয়ন), যুক্তরাজ্য (৩ ট্রিলিয়ন), ফ্রান্স (২.৫ ট্রিলিয়ন), ভারত (২.৫ ট্রিলিয়ন), ব্রাজিল (১.৯ ট্রিলিয়ন), ইতালি (১.৯ ট্রিলিয়ন) এবং কানাডা (১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার)।