logo

বিস্ময়কর সাফল্যে বাংলাদেশ

জুলকার নাইন


বিস্ময়কর সাফল্যে বাংলাদেশ

ঢাকা, ০১ জানুয়ারী- পাবনার প্রত্যন্ত উপজেলা চাটমোহরে বসে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পণ্যের অনলাইন মার্কেটিং করেন মো. তৌহিদুজ্জামান। অন্যরা যখন চাকরির জন্য ঢাকায় ছুটে আসেন, তখন এই তরুণ ঢাকা থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করে ফিরে গেছেন চাটমোহরে। কারও চাকরি না করে নিজেই আরও দুই ডজন তরুণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে হয়েছেন আর্থিকভাবে সচ্ছল। শুধু তৌহিদুজ্জামানই নন, উত্তরাঞ্চলের আরেক অনগ্রসর জেলা রংপুরের মওদুদ ইসলামও একই পথে হেঁটেছেন। শিক্ষা প্রশাসনের সরকারি চাকরির বাঁধন ছিঁড়ে ফেলে নিজ এলাকায় ফিরে তথ্য প্রযুক্তিকেই নিয়েছেন নিজের জীবিকা হিসেবে। সেখানেও কর্মসংস্থান হয়েছে আরও অনেকের। এই তৌহিদ ও মওদুদদের হাত ধরেই বিস্ময়কর অগ্রযাত্রার পথে রয়েছে বাংলাদেশ। আশা করা হচ্ছে, ২০১৮ সাল নাগাদ শুধু তথ্য প্রযুক্তি খাত থেকেই ১০০ কোটি ডলার আয় করবে বাংলাদেশ। অর্জিত হবে জিডিপির ১ শতাংশ। দেশে ৫ কোটির বেশি তরুণ থাকায় এ লক্ষ্যমাত্রাকে সহজসাধ্যই মনে করা হচ্ছে। তাই তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও এখন বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি খাতে এগিয়ে যাওয়ার প্রশংসা করেন প্রকাশ্যে। শুধু যে তরুণদের উদ্যমেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে তা নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সফলতা অর্জন করে নিয়েছে বাংলাদেশ। যেখানে দেশে দেশে সীমান্ত নিয়ে যুদ্ধবিগ্রহ হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারতের মতো আঞ্চলিক পরাক্রমশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে সীমান্ত জটিলতা দূর করে চূড়ান্ত করেছে মানচিত্র। ১১১ ছিটমহল নিজেদের মধ্যে বিনিময় করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছে ২০১৫-তে এসে। যুদ্ধবিগ্রহ ছাড়া এমন ঘটনা ইতিহাসে বিরল। স্থলসীমান্তের পাশাপাশি সমুদ্রের সীমান্তও নির্ধারণ হয়েছে কোনো ধরনের রক্তপাত ছাড়া।

মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে যথাক্রমে ২০১২ ও ২০১৪ সালে সমুদ্রের অর্থনৈতিক এলাকা ও মহীসোপানের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ। সামরিক বিরোধের বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের এমন অধিকারপ্রাপ্ত হওয়াকে নজিরবিহীন কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হওয়ার পরও বাংলাদেশ সাহসিকতার সঙ্গে মহাকাশে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব স্থাপন করতে যাচ্ছে। আগামী বছরই পাঠানো হচ্ছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। ইতিমধ্যেই এ জন্য মহাকাশের কক্ষপথ কেনা হয়েছে।  উন্নয়নের জন্য ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করে আরেকটি স্বপ্ন পূরণের পথেও রয়েছে বাংলাদেশ। সব কিছুই ঠিকঠাক। ২০২১ সালের মধ্যে পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করে সেখান থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ জাতীয় গ্রিডে যোগ করার পরিকল্পনা এখন বাস্তবায়নের পথে। বাংলাদেশের আরেকটি বিস্ময়কর সাফল্য নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়ে অগ্রসর হওয়া। শক্তিশালী পশ্চিমা প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন বাংলাদেশের সক্ষমতারই পরিচায়ক। এ ছাড়া নয় হাজার কোটি টাকায় কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে টানেল। মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু নতজানু হতে আর রাজি নয় বাংলাদেশ। এ ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সামাজিক খাতে বাংলাদেশের সাফল্য এখন বিশ্বের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর কাছে রীতিমতো রহস্য। ঈর্ষান্বিত অনেক উন্নত রাষ্ট্রও।

জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনের সাফল্য বিশ্বের অন্যান্য  দেশের কাছে বাংলাদেশকে করেছে রোল মডেল। স্যানিটেশনের ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বে নজির। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এখন উদাহরণ হিসেবেই দেখানো হয়ে থাকে বিশ্ব ফোরামে। এসব কারণে খোদ জাতিসংঘ এখন বাংলাদেশকে অনুসরণ করতে বলছে। গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানি বাংলাদেশকে দিয়েছে নতুন পরিচয়; বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্ রপ্তানিকারক এখন বাংলাদেশ। সব কিছু ছাপিয়ে গেছে নিম্নআয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশের বেরিয়ে আসা সাফল্য। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ ছিল নিম্নআয়ের দেশ, কিন্তু এখন মধ্যম আয়ের দেশ। জাতীয় আয় ১ হাজার ৪৫ ডলারের বেশি হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তালিকায় বাংলাদেশকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, এটি বাংলাদেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরই প্রতিফলন ও স্বীকৃতি। জাতি হিসেবে বাংলাদেশের জন্য অর্জন ও মাইলফলক।