logo

আলোচনায় ম্যাজিস্ট্রেট রুহুল আমীন

আলম দিদার ও আবু আজাদ


আলোচনায় ম্যাজিস্ট্রেট রুহুল আমীন

চট্টগ্রাম, ০১ জানুয়ারি- যে চিকিৎসকদের ওপর মানুষ সৃষ্টিকর্তার পরেই বিশ্বাস আর আস্থা রেখে জীবন বাঁচাতে তাদের কাছে ছুটে যান সেই চিকিৎসকের মোড়ক গায়ে দিয়ে যদি কেউ হয়ে উঠে ঘাতক! আর যেই ওষুধ সেবন করে রোগী জীবনের দিশা খোঁজার চেষ্টা করেন কিংবা নতুন করে জীবনের সন্ধান লাভ করেন সেই ওষুধই যদি হয় ভেজাল আর মরণঘাতি? তাহলে কেমন হবে তা কি ভাবা যায়? আসলে সহজে তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও এমনই সব কঠিন বাস্তবতাকে সমাজের সামনে তুলে এনেছেন একজন ম্যাজিস্ট্রেট।

আর দিনের পর দিন এই কাজটি করে তিনি কখনো হাতে নাতে ধরেছেন কথিত সেইসব চিকিৎসকদের আবার কখনো তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছেন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। কোনো  কোনো ফার্মেসি থেকে উদ্ধার করেছেন সরকারি হাসপাতালের গরীব রোগীদের বিনা মূল্যের ওষুধও। এমনকি এসব অভিযান পরিচালনা করতে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি অনেক অনৈতিক চাপেও তাকে টলাতে পারেনি এই ভেজাল ওষুধ বিরোধী অভিযান থেকে। যার ফল স্বরূপ তিনি ২০১৫ সালের চট্টগ্রাম বিভাগের সেরা ম্যাজিস্ট্রেট নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মূখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের হাত থেকে পুরুস্কার নিয়েছেন। দিনের পর দিন প্রসংশিত হচ্ছেন নাগরিক সমাজসহ সচেতন মহলে। এতোক্ষণ বলছিলাম ভেজাল ওষুধ বিরোধী অভিযান পরিচালনাকারী চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহি ম্যাজিস্ট্রেট ও রেভিনিউ কালেক্টর রুহুল আমীনের কথা।

অভিযান পরিচালনাতেই সীমাবন্ধ থাকেনি তাঁর কার্যক্রম। তাঁর এই অভিযানে গতি পেয়েছে ওষুধের দোকানের লাইসেন্স সংখ্যাও। বেড়েছে সরকারি রাজস্বের পরিমাণ। অনেকটা কমে এসেছি আমদানি ও বিক্রয় নিষিদ্ধ ওষুধ বিক্রির হার। কমে এসেছে ভেজাল ওষুধ বিক্রির প্রবণতা। এমনকি তাঁর অভিযান থেকে বাদ যায়নি ফুটপাতে অবস্থানকারী ‘সর্ব রোগের’ চিকিৎসকও! সেখানেও অভিযান চালিয়ে জব্দ করেছেন বিপুল পরিমাণ ভেজাল ও যৌন উত্তেজক ওষুধ। দণ্ড দিয়েছেন বেশ কয়েকজন ভূয়া চিকিৎসককে। সিলগালা করেছেন অনেক ফার্মেসি। হাসির মত শুনালেও রুহল আমীন আসছেন এমন খবর পেয়ে দোকান ফেলে পালিয়েছেন অসংখ্য ওষুধ মালিক।

রুহুল আমীন প্রকাশ রুবেল ১৯৮৫ সালের ১ ডিসেম্বর মাদারীপুর জেলার পানিছত্র গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা আমজাদ হোসেন হাওলাদার ও মা মৃত আয়েশা আক্তারের পাঁচ ছেলে ও দুই কন্যা সন্তানের মধ্যে দিত্বীয় রুহুল আমীন। সদ্য তিনি কন্যা সন্তানের জনক হয়েছেন তিনি। ২০১০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতোকোত্তর শেষ করেন ৩০ বিসিএস পরীক্ষায় (প্রশাসন) উত্তীর্ণ  হয়ে ২০১২ সালের ৩ জুন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও রেভিনিউ কালেক্টর হিসেবে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনে যোগদান করেন তিনি। যোগদানের পর থেকেই বন্দর নগরী চট্টগ্রামে কর্মরত আছেন রুহুল আমীন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনে যোগদানের পর নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে আসলে ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ভেজাল ওষুধ ও ভূয়া চিকিৎসক বিরোধী বিশেষ আদালত পরিচালনা শুরু করেন রুহুল আমীন।

ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের সাফল্য তুলে ধরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুহুল আমীন বলেন, ‘গত ৮ জুলাই থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে জেলা প্রশাসন কর্তৃক পরিচালিত ভ্রাম্যমান আদালত ৩৩টি অভিযান পরিচালনা করে। এসব অভিযানে ১৫২টি ফার্মেসীকে ২৩ লাখ ১১ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করেছে, এসময় ২৫টি দোকানকে সীলগালা করা হয়। এছাড়া তিন জনকে কারাদণ্ড প্রদানসহ ৫জন ভূয়া ডাক্তার সনাক্ত করা হয়। এছাড়া ১৪ লাখ টাকার ওষুধ জব্দ করা হয়।’


তিনি আরো জানান, জেলা প্রশাসন মোট ১০ ক্যাটাগরিতে এ অভিযান পরিচালনা করে। তা হলো-ভেজাল ওষুধ, মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ, অনুমোদনহীন ওষুধ, মিছব্রান্ড ওষুধ, নকল ওষুধ, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে আনা ভারতীয় ওষুধ, ফুড সাপ্লিমেন্ট,  সরকারি ওষুধ বিক্রি, নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ওষুধসংরক্ষণ, যথাযথ তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ না করা।

জেলা প্রশাসনের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে নবায়ন করা লাইসেন্সের সংখ্যা ছিল এক হাজার ১২২টি। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪০৬টিতে। এর মধ্যে চলতি বছরের জুলাইতে নবায়ন করা লাইসেন্সের সংখ্যা ছিল ১৪৯টি। অভিযান শুরুর পাঁচ মাস পর নভেম্বর মাসে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৬৭টিতে।

পরিসংখ্যানে আরো দেখা যায়, ২০১৪ সালের অগাস্টে লাইসেন্স নবায়নের সংখ্যা ছিল ২১০টি। চলতি বছরের একই মাসে সেটি হয়েছে ২৫৯ টি।নগত বছরের সেপ্টেম্বরে ২৩৪ টি লাইসেন্স নবায়নের বিপরীতে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা ২৭৭ টি। আর গত বছরের অক্টোবরে নবায়ন করা লাইসেন্সের সংখ্যা ২২৯টি বিপরীতে চলতি বছরের অক্টোবরে তা দাঁড়িয়েছে ৩৫৪টিতে। লাইসেন্স নরাবয়নের সংখ্যা বাড়ায় স্বাভাবিক ভাবেই বেড়েছে এ খাতে লাইসেন্স নবায়ন বাবত টাকা সংগ্রহের পরিমাণ তথা রাজস্ব আদায়। ২০১৪ সালের নভেম্বরে এ খাতে নগরী থেকে রাজস্ব আদায় ছয় লাখ ১৬ হাজার টাকা হলেও চলতি বছরের নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। এছাড়া গত অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রাজস্ব আদায় ছিল তিন লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে সেটি হয়েছে তিন লাখ ৮১ হাজার টাকা।

চলতি বছরের অগাস্টে রাজস্ব আদায় হয়েছে সাত লাখ ৫১ হাজার টাকা, যা আগের বছরের একই মাসে ছিল পাঁচ লাখ ৫১ হাজার টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে চার লাখ ৯৭ হাজার টাকা রাজস্ব আদায়ের বিপরীতে চলতি বছরের একই মাসে সেটি দাঁড়িয়েছে এগার লাখ ৬২ হাজার টাকায়। আগের বছর অক্টোবরে তিন লাখ ৮৩ হাজার টাকা রাজস্ব আদায় এবছর একই মাসে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে নয় লাখ ৫৯ হাজার টাকা।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুহুল আমীন বলেন, ‘অভিযান শুরুর পর থেকে লাইসেন্স নবায়ন করার একটা চাপ তৈরি হয়েছে ফার্মেসি মালিকদের। অভিযানে গিয়ে আমরা এমনও ফার্মেসি মালিক পেয়েছি-যারা গত ১০ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত লাইসেন্স নবায়ন না করে ওষুধ ব্যবসা করে যাচ্ছিলেন। অভিযানের কারণেই যেমন বেড়েছে নতুন ও নবায়নকৃত লাইসেন্সের সংখ্যা। তেমনি দ্বিগুন হয়েছে রাজস্ব আদায়ও।’


বিষয়টি এখানেই থেমে যায়নি, অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে ২৪ নভেম্বর (মঙ্গলবার) নগরীর ওষুধ পাড়া খ্যাত কোতোয়ালী থানার হাজির গলিতে ভেজাল ওষুধ বিক্রেতাদের হামলার শিকার হন তিনি। কিন্তু হামলা কিংবা রাজনৈতিক চাপ কোন বাধাই অভিযান পরিচালনা থেকে বিরত রাখতে পারেনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুহুল আমীনকে। এ ঘটনার পর ভালোভাবেই ভআলোচনায় চলে আসেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুহুল আমীন। এরপরও নগরীর বিভিন্ন স্থানে কিছু দিন বন্ধ থাকার ভেজাল ওষুধ বিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে থাকেন রুহুল আমীন।

হাজির গলিতে ভেজাল ওষুধ বিক্রেতাদের হামলার শিকার হবার মুহুর্তের কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘২৪ নভেম্বর আমি যখন হাজারী গলিতে প্রবেশ করি, তখনই বুঝতে পেরেছিলাম এখানে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, তবে আমি সব আশংকাকে উড়িয়ে দিয়ে ফোর্স নিয়ে নেমে যাই অভিযানে। সম্ভবত তিনটি দোকানে অভিযান শেষ করে চতুর্থ দোকানে প্রবেশ করব, ঠিক এমন সময় কয়েকজন যুবক বললেন, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব অনেকতো হইছে আর কত? কিন্তু আমি তাদের কথায় কান না দিয়ে অভিযান পরিচালনা করি। এসময় আমার ফোর্সের ওপর হামলা করেন ভেজাল ওষুধ বিক্রেতারা। তবুও আমি অভিযান বন্ধ করছিনা দেখে, কয়েকজন ওষুধ বিক্রেতা আমাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। হামলায় কয়েকজন আনসার সদস্য বেশ আহত হন। এছাড়া বিভিন্ন সময় ওষুধ বিক্রেতা আর রাজনৈতিক চাপতো ছিলোই।’