logo

জোটের অংক

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা


জোটের অংক

আগামী নির্বাচনের জন্য সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না যদি জোট বাঁধেন, তাদের সাফল্যের সম্ভাবনা কতটুকু? আসলে এই প্রশ্নটিই অবান্তর। তাদের কোনও সম্ভাবনাই নেই।

নেই, তবু তাদের তৎপরতা আছে। বলা হচ্ছে, অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্য প্রক্রিয়া এবং তারই দল গণফোরাম জোট না বাঁধলেও আপাতত যুগপৎ কর্মসূচি পালন করবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়ের পাশাপাশি দেশে একটি কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় পুরো সেপ্টেম্বরে ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচি দেবে যুক্তফ্রন্ট, ঐক্য প্রক্রিয়া ও গণফোরাম। এ মুহূর্তে তারা একমঞ্চে না এলেও নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা বিভিন্ন সভা-সমাবেশ-সেমিনার করে জনগণের মাঝে দাবি ছড়িয়ে দেবে। তবে বৃহত্তর কোনও ইস্যুতে যেকোনও সময় একমঞ্চে চলে আসতে পারেন এসব জোট ও দলের নেতারা।
পত্রপত্রিকায় এমন খবর এখন প্রায়ই আসছে। এই দলগুলোর কোনও গণভিত্তি না থাকলেও গণমাধ্যমে তারা ভালো জায়গা পাচ্ছেন। রাজনীতিতে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলে কিছু হয় না। কিছু ক্ষেত্রে একই সঙ্গে ‘হ্যাঁ’ও ‘না’ দুটোই হতে পারে। কিন্তু ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দলের ‘বড় এসব নেতা’এত ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ’করেই বারবার নিজেরাই আবার এক হতে পারছেন না।

হাত ধরতে আগ্রহ আছে তাদের, কিন্তু তাদের বড় দল লাগবে। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তাদের, কিন্তু আজ পর্যন্ত তারা নিজেদের কোনও সংসদীয় আসন পাকাপোক্ত করতে পারেননি। ফলে আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করতে হলে, তাদের বিএনপিতে যোগ হতে হয়। তারা একমত যে জোটের ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আর অন্যদিকে বিএনপিরও দৃশ্যত কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু সমস্যা হলো কেন, বিএনপি তাদের জন্য নিজেদের বা অন্য শক্তিশালী শরীকের নিশ্চিত আসনগুলো ছাড়বে? বি. চৌধুরী বলেছেন, বিএনপিকে জামায়াত ছাড়তে হবে। কিন্তু খালেদা জিয়া জেলখানা থেকে মির্জা ফখরুলকে দিয়ে যে বার্তা পাঠিয়েছেন, এতে পরিষ্কার যে, বিএনপি কখনোই জামায়াতকে ছাড়বে না। পেশীশক্তি আর জনসমর্থন বিচার করলে এসব নেতার চেয়ে জামায়াত বিএনপির কাছে ঢের উপযোগী।

প্রশ্ন হলো এরপরও কি বলা যায় যে, ঐক্য হবে তাদের মধ্যে? রাজনীতিতে অনেক সময় পাটিগণিত অপ্রযোজ্য। এই ময়দানে সবসময় দুই আর দুইয়ে চার হবে, এমন নয়। তাই বস্তুনিরপেক্ষভাবে জোটের সম্ভাবনা বিচার করতে হলে সংখ্যাই একমাত্র ভরসা। নাগরিক সমাজের এই গুটিকয়েক রাজনীতিকের রাজনীতিতে প্রভাব না থাকলেও গণমাধ্যমে তাদের প্রভাব আছে, বিদেশিদের সঙ্গে প্রগাঢ় সম্পর্ক আছে, আছে এনজিওগুলো সঙ্গেও সুসম্পর্ক। তাই এই বিশিষ্টজনদের সম্পর্কে রাজনীতির ময়দানে ধারণা হলো, রাজনীতির শ্রম না করে যেকোনও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মাঝে তারা ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ নিতে চেষ্টা করেন। এই ধারণা কোনও রাজনীতিক সম্পর্কে সুখকর না হলেও তাদের সম্পর্কে আছে ও তারা এ নিয়ে চিন্তিত নন বলেই মনে হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত রবিবার গণভবনে সংবাদ সম্মেলন করে দৃশ্যত এই জোট বা ঐক্য প্রক্রিয়াকে উপেক্ষাই করেছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভেতর এক ধরনের নির্ভারতা লক্ষণীয়। তা হলো, জোট নিয়ে ভাবনার কিছু নেই। বিষয়টা এমন যে, বিরোধীরা যেমন জোট করছে, করুক। কিন্তু এতে আওয়ামী লীগের কোনও ক্ষতি হবে না। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো, দলীয় কর্মীরা ‘সতেজ’আছে। এরসঙ্গে গত প্রায় দশ বছরে তাদের সরকার উন্নয়নের যে কাজ করেছে, তা এর আগে এদেশে কেউ করতে পারেনি। মানুষ তাই বিরোধী জোটকে চায় না। তারা শেখ হাসিনাকেই ভোট দেবে বলে তারা নিশ্চিত। এছাড়া একটা বিষয় তো রয়েছেই যে, জোট হোক, কিন্তু আওয়ামী লীগের মহাজোট তো আছেই।

ঠিক এমন একসময়েই যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআর আই) এক জরিপ করে বলেছে, দেশের ৬৬ শতাংশ মানুষের আস্থায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ১০ এপ্রিল থেকে ২১ মে’র মধ্যে জরিপটি চালানো–এই জরিপে বেরিয়ে আসে যে, দেশের ৬৪ শতাংশ মানুষ মনে করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারই দেশের জন্য শ্রেয়। এতে আরও বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি আশানুরূপ পথে এগিয়ে চলেছে। দেশের ৬২ শতাংশ মানুষই এমনটা মনে করেন। আর অর্থনৈতিক উন্নয়নে সন্তুষ্ট রয়েছেন ৬৯ শতাংশ দেশবাসী। আর ৪৯ শতাংশ মানুষ তাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী।

জোটের আলোচনা চলবে, চলতেই থাকবে শেষ সময়-পর্যন্ত। বিএনপি-জামায়াতের ২০ দলীয় জোটের ভোটের জন্য আসন ভাগাভাগী কী দাঁড়াবে, খালেদা জিয়ার মুক্তি না হলে তারা কী পন্থায় নির্বাচন করবে, সে বিষয়গুলোর এখনই সুরাহা হবে–এ বিষয়ে নিশ্চিত নয় এখনও।

ড. কামালরা জোট করছেন। কিন্তু এই জোট কী চায়, তাদের নীতি কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু জোট-নেতাদের সম্পর্কে সামাজিক ধারণা যদি এই হয় যে, তারা সুবিধাবাদী, তাহলে এ নিয়ে কতদূর যাওয়া যাবে, তা এক বড় জিজ্ঞাসা। এই বুদ্ধিজীবী রাজনীতিকরা আওয়ামী লীগের অপশাসনের কথা বলেন। একথা সত্য বলে ধরে নিলেও বলতেই হবে, এই শাসন থেকে মুক্তি কোনও শর্টকাট পথ ধরে আসবে না। মানুষের দাবির ভিত্তিতে সংগঠিত গণ-আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে, বিকল্প নীতির ভিত্তিতে রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমেই তা সম্ভব। সেটা কি তারা পারবেন?

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

এমএ/ ১০:২০/ ০৫ সেপ্টেম্বর