| Call For Add |
| |
| Call For Add |
|
| শ্রদ্ধাঞ্জলী : মহিউদ্দিন শীরু |
|
মহিউদ্দিন শীরু। একজন প্রতিথযশা সাংবাদিক, কবি, গীতিকার ও শিক্ষাবিদ। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সিলেট ব্যুরো প্রধান। গত ২৬শে সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে সিলেটের নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। খবরটি যখন আমাদের কাছে পৌঁছে তখন আমার পরিবারে বিষাদের ছায়া নেমে আসে। সম্পর্কে তিনি আমার স্ত্রীর বড় ভাই।
আমি কোন মৃত্যু সংবাদে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারি না। সান্তনা দেবার শব্দ খুঁজে পাই না। কি করবো বুঝে উঠতে পারি না। সারাদিন কেবল ঘুমিয়ে কাটাই। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সকালবেলা তাজুল মোহাম্মদকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দুঃসংবাদটি দিয়ে সেই যে বিছানায় গেলাম একটানা তিনদিন শুয়ে-ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছি। বার বার তাঁর কথা মনে পড়তে থাকে। চোখের সামনে দেখতে পাই সবার প্রিয় শীরু ভাইকে। এই তো মাত্র কিছুদিন আগে সুস্থ সবল অবস্থায় তাঁকে রেখে এসেছিলাম। সেই লোকটি নেই একথা ভাবতে আমার অনেক কষ্ট।
স্ত্রীর বড় ভাই হিসেবে প্রথম প্রথম তাঁর সাথে আমার একটু দূরত্ব ছিল। ইংল্যা-ে গিয়ে (১৯৮৬ সাল) সেই দূরত্ব কিছুটা কমে আসে। হিথরো বিমানবন্দরে তিনি আমাকে নিতে আসেন এবং যে ক’দিন ছিলাম আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বাড়িতে নিয়ে ঘুরে বেড়ান। লেখালেখির সুবাদে সম্পর্ক আরও গাঢ় হয়। তবে এবছর বাংলাদেশে আমার সর্বশেষ সফরে তাঁর সাথে আমি বেশি সময় কাটিয়েছি। আমার লেখা বই প্রকাশিত হওয়ায় তিনি খুব খুশি হন। সিলেটে বইটির বাজারজাত করার জন্য নিজেই উদ্যোগ নেন।
এবার আব্দুল গাফফার চৌধুরীকে সিলেটবাসীর পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। সংবর্ধনা কমিটির আহবায়ক ছিলেন শীরু ভাই। আমি তখন ঢাকায়। শীরু ভাই বললেন সিলেট আসতে। এই প্রথম গাফফার চৌধুরীর সিলেট আগমণ। আমি সেই অনুষ্ঠানে সস্ত্রীক যোগ দিই। গাফফার ভাইকে বললাম, এতদিন ল-নের সিলেটিদের দেখেছেন এবার আসল সিলেটিদের দেখে যান। তিনি বললেন, ‘সিলেট না এলে আমার জীবনটা অসম্পূর্ণ থেকে যেতো’। সিলেটিদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ গাফফার চৌধুরী যাবার সময় আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘এই তোমরা সকলে সকলের আত্মীয় নাকি?’
একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে মহিউদ্দিন শীরু সিলেটের সুধী সমাজে পরিচিত ছিলেন। বহুমুখী প্রতিভার এ মানুষটি তাঁর এলাকার জন্য, সিলেটবাসীর জন্য অনেক কিছু করেছেন। তিনি ছিলেন একজন সফল সংগঠকও। সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমী, সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট প্রেসক্লাবের সাথে তিনি ওতোপ্রতোভাবে জড়িত ছিলেন। দু’বার তিনি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু পরিষদ সিলেট জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক।
১৯৭৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় এমএ ডিগ্রী লাভ করেন। তবে ১৯৭৩ সাল থেকেই তিনি সংবাদপত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট। সাপ্তাহিক যুগভেরির মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু হয়। তিনি দৈনিক বাংলার বাণীর বিশেষ প্রতিনিধি ছিলেন। এছাড়া সিলেট থেকে প্রকাশিত দৈনিক সুদিন ও সাপ্তাহিক গ্রাম সুরমা পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। কবি হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল। তিনি সিলেট বেতারের একজন স্বনামধন্য গীতিকার ছিলেন।
১৯৮৬ সালে ইংল্যা-ে আসার পর তিনি সাপ্তাহিক সুরমা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে পত্রিকাটিকে খুবই জনপ্রিয় করে তুলেন। ল-নের সাংবাদিক মহল শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে তাঁর নাম উচ্চারণ করে থাকেন। তাঁর অকাল প্রয়াণে ল-নে কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা বুঝা যায় শামীম আজাদের লেখাতে। ‘‘...দেশে যাওয়ার আগেই এখান থেকে যার নাম, পরিচিতি ও অবস্থান সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞাত হলাম, তিনি মহিউদ্দিন শীরু। গীতিকার, কবি ও সাংবাদিক। সবচেয়ে বড় কথা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রসে সিক্ত তাঁর হৃদয় কমল। বিলেতের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক সুরমার সূচনালগ্নে তিনিই তার ভিত গেড়ে দেন শক্ত হাতে। আর এখানেরই সাপ্তাহিক ‘পত্রিকা’র শ্রী ও ছাঁদের যাচাই-বাছাইও তাঁর হাতে। বিলেতের তরুণ বাঙালি সাংবাদিকদের তিনি ছিলেন এক কঠিন কম্পাস। তাঁর স্বপ্ন কাগজ ‘সুদিন’, ‘গ্রাম সুরমা’ যেন ম্লান মলাটে ঢেকে ফেলেছে পুরো ব্রিকলেন। তাঁর এ অকস্মাৎ প্রয়াণে পুরো বাঙালিপাড়া ঝুলে পড়েছে।...’’ (প্রথম আলো : ৫ নভেম্বর, ২০০৯)
সিলেটের শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন। সর্বশেষ প্রতিষ্ঠা করেন বালাগঞ্জ কলেজ। এ কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন তিনি। আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম শুনে যে, তিনি প্রতিদিন সিলেট শহর থেকে বালাগঞ্জ যাওয়া আসা করতেন। কতটুকু নিবেদিত না হলে একজন মানুষ এত কষ্ট সহ্য করতে পারেন তার উদাহরণ তিনি নিজে।
তাঁর জীবনে তিনি অসংখ্য পত্রিকা, ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেছেন। ১৯৯৮ সালে তিনি ‘সিলেটের শতবর্ষের সাংবাদিকতা’ নিয়ে একটি বই লেখেন। বইটি শুধু সিলেটের নয় এটা সমগ্র বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাস, একটি মূল্যবান দলিল গ্রন্থ। ইতিহাস এবং তথ্যনির্ভর এ ধরণের বই বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি এখনও প্রকাশিত হয়নি।
মহিউদ্দিন শীরুর স্ত্রী হাসিনা চৌধুরী একজন বিদুষী, সুগৃহিনী, অতিথিপরায়ন হাসিখুশী মানুষ। মানুষকে আপন করে নেয়ার ক্ষমতা তাঁর অসীম। দুই সন্তান অনি আর অমু নিয়ে তাদের সুখের সংসার। অনির বিয়ে হয়ে গেছে। অমু হাইস্কুলে পড়ছে। সে আবার আমার খুব ভক্ত। আমার সাথে তার বন্ধুত্ব। বাড়িতে গিয়ে আগে তাকে খুঁজতাম। বলতাম, আমার ফ্রে- কোথায়?
সর্বশেষ জানতে পারলাম গভীর রাতে মৃত্যু সংবাদটি নিয়ে সে আত্মীয়দের বাসায় বাসায় গিয়ে সবাইকে ডেকে এনেছে। তখন পর্যন্ত সে জানতো না তার বাবা মারা গেছেন। সে ভাবতেই পারেনি তার অমন হাসিখুশী বাবা এভাবে তাকে ছেড়ে চলে যাবেন!
আমার ফ্রেণ্ড-এর মলিন মুখটি আমার চোখে ভাসছে।
|
| |
|
| Call For Add |
| |
| Call For Add |
|