বিএনপি‘র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামীতে যুক্তরাজ্যের নাগরিক হতে পারেন। গত সপ্তাহে তার ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের খবর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশের পর এ সম্ভাবনাটুকু উজ্জল হলো। বাংলাদেশের রাজনীতিতে টপ ফাইভের একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ তারেক জিয়া। অনেকেই বলে থাকেন তারেক জিয়াই নেতৃত্ব দেন বিএনপি‘র, এমনকি সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রনও তার নেতৃত্বেই হয়ে থাকে। এর আগে যুক্তরাজ্য বিএনপি‘র কার্যক্রম স্থগিতে তার যে হাত আছে বা ছিলো, তা সাংগঠনিকভাবে কেউ স্বীকার না করলেও পর্যবেক্ষকদের ধারনা এটা তারেক জিয়ার ইঙ্গিতেই হয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশ কিংবা লন্ডনের পত্র-পত্রিকায় ইতিপূর্বে এই আভাসই দেয়া হয়েছিলো।
যুক্তরাজ্য বিএনপি‘র কার্যক্রম স্থগিতের পর বিএনপির কমিটি গঠন নিয়ে বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছিলো। এখানকার বিএনপি রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট সক্রিয় কিংবা এমনকি নিস্ক্রিয় অনেকেই এই কমিটির সাথে সংযুক্ত হবার প্রত্যাশায় ছিলেন। রাজনীতিতে নতুন মেরুকরন হতে পারে এ সম্ভাবনা ছিলো। অনেকেই মনে করেছিলেন বিএনপি‘র নেতৃত্বে এমন কেউ আসবে, যিনি এই কমিউনিটিকে ভালো জানেন আবার বিএনপি‘র রাজনীতিকে সুসংগঠিত করে ব্রিটেনে বিএনপি‘র একটা ক্লীন ইমেজ তৈরী করবেন। কারন বিগত কমিটির কার্যক্রম স্থগিত হবার পেছনে যে কয়েকটি কারন ইতিপূর্বে পত্র-পত্রিকায় এসেছে, তা বিএনপি‘র সেই ইমেজকে ম্লান করে দিয়েছিলো। সেজন্যেই বিএনপি‘র নতুন কমিটি কিভাবে হবে, কে আসবেন, কার নেতৃত্বে চলবে ------বিএনপি‘র যুক্তরাজ্য কমিটি নিয়ে সে ছিলো এক বড় প্রশ্ন অন্তত বিএনপির ব্রিটেনের কর্মীদের কাছে। বিএনপি বাংলাদেশে প্রধান বিরোধী দল। বিএনপি‘র নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইতিমধ্যে ঘোষনা দিয়েছেন "আমরা ক্ষমতায় আসছি, কাউকে ছাড়বো না"--- সুতরাং বিএনপি‘র রাজনীতিতে যেন একটা কনফিডেন্সের হাওয়া বইছে। সেই কনফিডেন্সের সময় তারেক জিয়ার রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্তি কিছুটা হলেও যেন সমীকরনে গোলমেলে করে দিয়েছে।
বিএনপি’র নতুন নেতৃত্বে কে আসছেন----এ প্রশ্ন এখন ভাটা পড়লেও বিএনপি‘র নুতন নেতৃত্ব আসবে। প্রাণ পাবে বিএনপি ,যুক্তরাজ্যে--- এ আশা সকল কর্মী-সমর্থকদের। কেউ কেউ মনে করেন তারেক জিয়ার রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্তী এতে ভাটা পড়বে, তবে তৃনমূল কর্মীরা মনে করছেন এখন নেতৃত্ব আর গতিলাভ করবে। এই দোলাচলের মাঝেই যুক্তরাজ্য বিএনপি‘রর কর্ণধার হতে এখন অন্তত পাচজন নেতা আছেন,যারা বিভিন্নভাবে কর্মতৎপরতা চালাচ্ছেন।
প্রথমেই আসতে পারে গত কমিটির আহবায়কের নাম। আব্দুল মালেক। যিনি এখনও নিজেকে বিএনপির যুক্তরাজ্য কমিটির আহবায়ক হিসেবে মনে করেন। আব্দুল মালেক মনে করেন কেন্দ্রীয় কমিটি যুক্তরাজ্য কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করেছে, যুক্তরাজ্য কমিটি বাতিল করেনি। এবং তিনি বিশ্বাস রাখেন তার এবং তার কমিটির মূল্যায়ন সাপেক্ষেই কেন্দ্রীয় কমিটি এই স্থগিতাদেশ তোলে নিয়ে তার কমিটিকেই পুনরায় যুক্তরাজ্যের কমিটি হিসেবে বিবেচনায় নেবে। জনাব মালেক বলেন তার বিরুদ্ধে পত্র-পত্রিকায় আনা অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবে না দেখে বরং সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখা উচিৎ। কারন তার কথা অনুযায়ী জিয়া ভবন,দুই হাজার টাকার কথিত চাদাবাজি,অপ্রতিদ্বন্ধি প্রেসিডেন্ট হিসেবে আগামী সম্মেলনে কাউকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী না করা সবকিছুই ছিলো আহবায়ক কমিটির সিদ্ধান্ত। এটা কোন চাপিয়ে দেয়া ব্যাপার নয়।
নতুন কমিটিতে কে আসবেন, এ নিয়ে কেউই মুখ খোলতে নারাজ। তবে নাম আসছে বিগত কমিটির যুগ্ন আহবায়ক ব্যারিষ্টার আব্দুস সালামেরও। ব্যারিষ্টার সালাম নিজেকে যুক্তরাজ্যে একজন সফল বিএনপি‘র সংগঠক হিসেবে মনে করেন। তার কথায় তিনি বিগত সময়ে বিশেষত আন্তর্জাতিক লবি যেমন বিভিন্ন সময় এদেশের মূলধারার এমপি কিংবা রাজনীতিবিদদের সাথে দেশের সংগঠনের লিংক তৈরীতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছেন, যা এমনকি বাংলাদেশে বর্তমান বিরোধী দলের আন্দোলনে একটা প্রধান ভূমিকা রাখতে পেরেছে। সেজন্যে বিএনপি‘র যুক্তরাজ্য কমিটির কর্নধার হতে তার আশাবাদ থাকলেও কেন্দ্রীয় বিবেচনাকেই তিনি প্রাধান্য দিচ্ছেন।
এদিকে যুক্তরাজ্য বিএনপি‘র রাজনীতিতে আরেক নতুন মুখ হলেও সামাজিক পরিচিতি তার ব্যাপক, সাংবাদিক হিসেবে তিনি খ্যাতি পেয়েছেন ব্রিটেনের বাঙালি কমিউনিটিতে, একসময় সিলেট জেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে সিলেটের বিএনপি সংগঠিত করতে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা, সেই মানুষটি বিএনপি‘র এই সংকটে সামনে এসেছেন। তিনি হলেন নজরুল ইসলাম বাসন। তিনি মনে করেন, যেভাবেই হোক বিএনপি এখানে একটা সংকট সময় অতিক্রম করছে।এই সময়ে ক্লীন ইমেজের নেতৃত্ব আসা প্রয়োজন। বিএনপি নিয়ে যে নেতিবাচক প্রচাব এই ব্রিটেনে, তা থেকে উত্তরনে তিনি ভূমিকা রাখতে চান। তিনি আশাবাদী, সাংবাদিক হিসেবে একজন কমিউনিটি সংগঠক হিসেবে একসময়ের রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে তিনি এই কাজটুক করতে পারবেন। তারেক জিয়ার প্রসংগ আসতে তিনি বললেন, বাংলাদেশের এই তরুন নেতার চারবছর ব্রিেেটনে অবস্থান তাকে আরও পরিপক্ষতা দিয়েছে । তার সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই তিনি বাংলাদেশের নেতৃত্বে গিয়ে জঙ্গিবাদ নির্মুল,দেশের নেতৃত্ব নির্বাচনে ডাইনামিক নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন।
এছাড়াও যাদের নাম আসছে তারা হলেন মিয়া মনিরুল ইসলাম এবং মহিদুর রহমানের । মিয়া মনিরুল ইসলাম বয়সে প্রবীন। বিএনপির রাজনীতিতে তার অবদান থাকলেও তারুন্য-নির্ভর কমিটিতে হয়ত তিনি জায়গা না-ও পেতে পারেন। এদিকে মহিদুর রহমান একসময় যুক্তরাজ্য বিএনপি সভাপতি ছিলেন। তার একটা ক্লিন ইমেজ আছে বিএনপি‘র নেতা-কর্মীদের কাছে। কিন্তু নতুন নেতৃত্বের দৌড়ে তিনি কতটুকু এগুতে পারবেন,তা প্রশ্নসাপেক্ষ। জানা গেছে তিনি মৌলভীবাজারে সংসদ নির্বাচন করতে আগ্রহী। এই আগ্রহ হয়ত যুক্তরাজ্যে দলের নেতা হওয়ার পথে তার জন্যে অন্তরায়ও হতে পারে। এদিকে তার সাবেক কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদটি তিনি পেয়ে গেলে হয়ত যুক্তরাজ্য বিএনপি‘র নেতৃত্ব নেয়ার দিকে না-ও ঝুকতে পারেন। তবে আগামীর নেতা নির্বাচনে মহিদুর রহমানের নাম উচ্চারিত হচ্ছে যুক্তরাজ্য বিএনপি‘র অনেক নেতা-কর্মীর কাছ থেকে।
অনেকেই মনে করছেন তারেক জিয়ার রাজনৈতিক আশ্রয়লাভ যুক্তরাজ্যের বিএনপি রাজনীতিতে তাকে আরও সক্রিয় করে তোলবে। কিন্তু এর পক্ষে আমি কোন যুক্তি খোজে পাই না। কারন তারেক জিয়া বাংলাদেশের বিএনপি রাজনীতির এক প্রধান দিকপাল, সেই হিসেবে বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর বিএনপি ঘরানার নেতা তিনি। সেজন্যে যুক্তরাজ্যে তার বিএনপি‘র নেতা হবার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে করার কোন যুক্তিসঙ্গত কারন নেই। বরং আমার বিশ্বাস তারেক জিয়ার এই নতুন অভিবাসনের ধারায় এখানকার নেতা-কর্মীরা আরও উদ্বুদ্ধ হবে। যুক্তরাজ্যে বিএনপি এখন ভালো নেতৃত্ব আশা করতেই পারে। চার বছরের অভিজ্ঞতায় উন্নত বিশ্বের রাজনীতির কিছুটা হলেও তারেক জিয়ার জেনে যাবার কথা। বাংলাদেশের আন্দোলন সংগ্রামে এদেশী প্রভুদের কিভাবে তুষ্ট করতে হয়, কাদের দিয়ে এসব কাজ উদ্ধার করা যাবে, তা এখন জেনে গেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক লিংক-কে প্রাধান্য দিয়েই হয়ত তারেক জিয়া এখন নতুন নেতৃত্বের সন্ধানে আছেন। কারন তারেক জিয়াদের বিদেশ-বিভূইয়ে মানায় না। দেশটা তাদের কাছে স্বর্গের মতো। স্বর্গের হাতছানি কি পায়ে ঠেলে দেয় কেউ ? তার দলের বিভিন্ন শাখার নেতা-কর্মীরাও কিন্তু তা-ই মনে করছে।
ফারুক যোশী:যুক্তরাজ্য অভিবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট