লগ-ইন
¦ নিবন্ধিত হোন
Logo
Chief Editor: Nazrul Minto
editor@deshebideshe.com
Wednesday | 22 May | 2013
 
Default Page
Bangla Problem
FB
Twitter
RSS

গড় রেটিং: 1.0/5 (2 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

Update : 2012-06-25 04:42:15
বাঙালির চরিত্র বৈশিষ্ট্য এবং আওয়ামী লীগে তার প্রতিফলন
আবদুল গাফফার চৌধুরী
শেরেবাংলা ফজলুল হক যখন সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন তখন পদাধিকারবলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবর্তন উৎসবে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ও ধস ঃযব ষরারহম যরংঃড়ৎু ড়ভ ইবহমধষ ভড়ৎ যধষভ ধ পবহঃঁৎু’ (আমি বাংলার অর্ধশতাব্দীর জীবন্ত ইতিহাস)। কথাটা ব্যক্তি ফজলুল হক সম্পর্কে সত্য। কিন্তু সংগঠন হিসেবে বলতে গেলে পাকিস্তান সৃষ্টির আগে থেকে একাত্তরের স্বাধীনতা এবং বর্তমান দশক পর্যন্ত বাঙালি ও বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাসের সঠিক প্রতিবিম্ব আওয়ামী লীগ। চল্লিশের দশকের শেষের দিক থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের বাঙালির চরিত্রে যত পরিবর্তন ঘটেছে, তার সব পরিবর্তনের চিহ্ন পাওয়া যাবে আওয়ামী লীগ নামক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের শরীরে।
বাঙালি মুসলমানের চরিত্র স্ববিরোধিতায় পূর্ণ। কৃষি সমাজ জীবনের রক্ষণশীলতা ও অনাধুনিকতা এবং নব্য ধনী হওয়া সত্ত্বেও নিুমধ্যবিত্তের হীনমন্যতা বোধ থেকে সে এখনও মুক্ত হতে পারেনি। আÍপরিচয়ের সংকটে (ঈৎরংরং ড়ভ রফবহঃরঃু) তারা এখনও ভোগে। চরিত্রে অনেক সময় আপস, আÍসমর্পণকারী ও সাংস্কৃতিক চেতনায় বিভক্ত; কিন্তু কখনও কখনও রাজনৈতিকভাবে একরোখা এবং কঠিন সংগ্রামী। আওয়ামী লীগের মধ্যে বাংলাদেশের বাঙালির এই চরিত্রের সব ক’টি উপাদান খুঁজে পাওয়া যাবে।
ফজলুল হকের হাতে অবিভক্ত বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের জš§। নাম নিখিল বঙ্গ কৃষক প্রজা পার্টি। বাঙালি মুসলমানের মধ্যে তখনও পূর্ণ বিকশিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের জš§ হয়নি। তাই ফজলুল হক তার অসাম্প্রদায়িক দলেও ঢাকার নবাব, ফরিদপুরের জমিদার থেকে মৌলবাদী মওলানাদেরও গ্রহণ করেছিলেন। ফজলুল হকের প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলেই তার সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিষ্ঠা ও সমাজে আধিপত্য লাভের সূচনা ঘটে।
এই মধ্যবিত্ত পরে আরও সুবিধা ও সুযোগ লাভের আশায় সাম্প্রদায়িকতার খোলস পরিধান করে এবং পিতৃহন্তার ভূমিকা নেয়। নিজের সৃষ্ট মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হাতে ফজলুল হকের নেতৃত্বের বিপর্যয় ঘটে এবং কৃষক প্রজা পার্টির বদলে মুসলিম লীগ বাংলার রাজনীতিতে একাধিপত্য বিস্তার করে। পাকিস্তান আন্দোলনে অবিভক্ত বাংলার মুসলমানরাই মিলিট্যান্সি ঢোকায় এবং ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগানের জš§ দেয়। এই লড়াই হওয়ার কথা ছিল ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে। কিন্তু মুসলিম লীগের তদানীন্তন অবাঙালি নেতৃত্ব সুকৌশলে তাকে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক লড়াইতে পরিণত করে। ভারতের সঙ্গে অবিভক্ত বাংলাদেশও সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বিভক্ত হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমরা অনেকেই অনেক সময় একটা বড় ভুল করি। আমরা বলি, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই বাঙালি মুসলমান সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অকল্যাণ ও ভুল বুঝতে পারে এবং বদরুদ্দীন উমরের অভিমত অনুযায়ী বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন শুরু হয়। কথাটা সঠিক নয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ফজলুল হকের কল্যাণে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রথম স্বাদপ্রাপ্ত এবং প্রতিবেশী উন্নত হিন্দু সমাজের সঙ্গে সব ধরনের প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত হয়ে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অবাধ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত দেখছিল তা চরম আঘাত পায়।
বাঙালি মুসলমানের সুবিধাবাদী নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। ফলে তারা মুসলিম লীগের অবাঙালি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রথমেই মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির খোলস ত্যাগ করেনি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দু’বছরের মাথায় তারা যে আলাদা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের জš§ দেয়, সেটিও একটি পাল্টা সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান, নাম আওয়ামী মুসলিম লীগ। এ সময় পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে ফজলুল হকের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে বাড়ছে, কিন্তু তার অসাম্প্রদায়িক নামের কৃষক প্রজা পার্টি (পরিবর্তিত নাম কৃষক শ্রমিক পার্টি) কোন প্রতিষ্ঠা পায়নি। ফলে কেবল ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের থিওরিটা সর্বাংশে সঠিক নয়।
সাম্প্রদায়িক রাজনীতির খোলস ত্যাগ করে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির দিকে মুখ ফেরাতে বাংলাদেশের মুসলমানের লেগেছে আট বছর। পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে এসে আওয়ামী মুসলিম লীগ মুসলিম শব্দটি বর্জন করে আওয়ামী লীগ হয় এবং সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠানের দরজা খুলে দেয়। স্বতন্ত্র নির্বাচন পদ্ধতির বদলে যুক্ত নির্বাচন পদ্ধতি গ্রহণের দাবি জানায়। তা সত্ত্বেও দেখা যাবে, দীর্ঘ ৬৩ বছরের ইতিহাসে আওয়ামী লীগে সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদক পদে একজন হিন্দু ও বৌদ্ধ বা অপর সম্প্রদায়ের কোন ব্যক্তি কখনও নির্বাচিত অথবা মনোনীত হননি। যদিও ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের শতাধিক বছরের ইতিহাসে স্বাধীনতা-পূর্বকাল থেকে বহু মুসলমান, শিখ ইত্যাদি সম্প্রদায়ের নেতা দলটির সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। এমনকি ভারত স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রপতিও হয়েছেন। বাংলাদেশে অমুসলমানদের এই উচ্চপদে নির্বাচিত হওয়ার আশা করা এখনও বাতুলতা।
পাকিস্তান সম্পর্কে মোহভঙ্গ হওয়ার পর বাঙালি মুসলমান প্রথমে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির দিকে মুখ ফেরায়। ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের দিকে মুখ ফেরায়নি। ষাটের দশকে ছয় দফা আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রকে দলের দুটি আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে, তার আগে নয়। ’৭১-এর স্বাধীনতার যুদ্ধেও ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ একটি প্রেরণা ছিল। মূল প্রেরণা ছিল না। বাংলাদেশেরই একজন সমাজবিজ্ঞানীর মতে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের উৎপত্তি। ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ তার মূল প্রেরণা ছিল না। এই ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ে সঠিক সচেতনতাও ছিল না। সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছিল না। এটিকে সে­াগান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
তা না হলে স্বাধীন বাংলাদেশ একটি সেকুলার গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগেরই একজন সাবেক প্রবীণ নেতা আবুল মনসুর আহমদ দাবি করে বসতে পারেন না যে, স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাবের (১৯৪০) অর্থাৎ ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতেই হয়েছে। সেকুলার জাতীয়তা বাঙালিদের মনে আওয়ামী লীগ সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে ভারত-বিদ্বেষের আবরণে পাকিস্তানপ্রীতি এবং বাংলাদেশী জাতীয়তার আবরণে সাম্প্রদায়িক জাতীয়তা স্বাধীন বাংলাদেশে এত শিগগির মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারত না।
পৃথিবীর অন্য কোন অর্ধসভ্য দেশেও যা ঘটেনি, বাংলাদেশে তা ঘটেছে। স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছর না যেতে স্বাধীনতার শত্র“পক্ষ এবং উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ ক্ষমতা দখল করে রাষ্ট্রের সেকুলার ভিত্তিকে উপড়ে ফেলার চক্রান্তে সফল হয়েছে। সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মের বিধান সংযুক্ত হয়েছে। রাজনীতিতে সেকুলার কালচারকে পরাভূত করে ধর্মীয় কালচার আবার প্রাধান্য বিস্তার করেছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকেও এই ধর্মীয় রাজনৈতিক কালচার মেনে নিতে হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের আনুকূল্যতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের বর্তমান সরকারও ’৭২-এর সেকুলার সংবিধানের মৌলিক চরিত্রে ফিরে যেতে সাহসী অথবা ইচ্ছুক হয়নি।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালি মুসলমানের অবদান সবচেয়ে বেশি ছিল, তাদের দ্রুত মোহভঙ্গের কারণ, তারা দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় সমান অংশীদারিত্বের সুযোগ ও অধিকার থেকে শুরুতেই মুসলিম লীগের অবাঙালি নেতৃত্বাধীন দল ও সরকার তাদের বঞ্চিত করার নীতি গ্রহণ করে। দেশটির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সব হেডকোয়ার্টারই প্রতিষ্ঠা করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ তখন অর্জন করে পূর্ব পাকিস্তান, ব্যয় হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। দেশের রক্ষা ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য সবই তাদের কর্তৃত্বাধীন। তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে বাঙালির ভাষা সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে পূর্ব পাকিস্তানকে প্রকৃতই একটি নব্য উপনিবেশে পরিণত করার চেষ্টা শুরু হয়।
ফলে সমাজের অগ্রসর শ্রেণী হিসেবে ছাত্রসমাজ প্রথম ভাষা আন্দোলনে এগিয়ে আসে। ভাষা বদলের মাধ্যমে বাঙালিদের পাকিস্তানের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করা এবং শিক্ষা, চাকরি-বাকরি সর্বক্ষেত্রে তাদের উর্দুভাষীদের একাধিপত্যের গ্রাসে ঠেলে দেয়াই যে শাসকদের আসল উদ্দেশ্য, বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের তা বুঝতে দেরি হয়নি। ফলে তারা দ্রুত ছাত্রদের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং আওয়ামী লীগও ভাষা আন্দোলনে সর্বাÍক সমর্থন জানাতে এগিয়ে আসে।
আমি অনেকের সঙ্গে সহমত পোষণ করি যে, মূলত সেকুলার জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে নয়, আÍরক্ষার প্রচণ্ড তাগিদ থেকে বাংলাদেশের মুসলমান মধ্যবিত্ত বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বর্মগুলো ধারণ করতে বাধ্য হয়। বন্দুকের সাহায্যে পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকেরা যখন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সর্বপ্রকার অধিকার হরণে উš§ত্ত, তখন সেই অজগরের গ্রাস থেকে বাঁচার জন্য নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তারা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির হাজার বছরের ঐতিহ্য রবীন্দ্র-নজরুল সঙ্গীত, লোকসঙ্গীত, নববর্ষ, শারদ উৎসব, পৌষপার্বণ, নবান্ন সবকিছুকে ধারণ করে আÍরক্ষার বর্ম তৈরি করার চেষ্টা করেছে। এগুলোর প্রতি সহজাত ভালোবাসা এসেছে অনেক পরে। সামরিক শাসকদের বর্বর অস্ত্রের শাসন থেকে রক্ষার জন্যই বাঙালি মুসলমানকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির হাজার বছরের পুরনো বর্মগুলোর আড়ালে আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছিল। এজন্যই দেখা যায়, দলের নাম নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ হলেও দলটির আসল শিকড় এবং শক্তির ভিত্তি ছিল পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকদের অনুসৃত বৈষম্যনীতির প্রতিবাদ জানানো এবং পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অধিকার আদায়, দাবি-দাওয়া আদায় করাই ছিল আওয়ামী লীগের প্রধান কর্মসূচি। প্রথমে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনাধিকার আদায়ই ছিল আওয়ামী লীগের মূল লক্ষ্য। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কাছে আওয়ামী লীগ সর্বাধিক জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
পঞ্চাশের দশকে সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির দিকে মুখ ফেরানো, নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি এবং পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ইত্যাদি যে দাবিগুলো ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বামপন্থী দলগুলোর দাবি, ষাটের দশকের মধ্যভাগে আওয়ামী লীগ (শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর) সেই দাবিগুলোই গ্রহণ করে এবং তাকে অপ্রতিরোধ্য গণদাবিতে পরিণত করে। ছয় দফা থেকে স্বাধীনতার যুদ্ধ বাঙালি চরিত্রের এই বিবর্তনের ফল। শেখ মুজিবের নেতৃত্ব পুনর্গঠিত আওয়ামী লীগ তাকে ধারণ করেছে এবং সেই দাবি আদায়ের যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে।
বামপন্থী প্রধান দলগুলো যে এই যুদ্ধে মূল নেতৃত্ব দিতে পারল না, বরং নেতৃত্বদানের দ্বিতীয় সারিতে পিছিয়ে গেল, তার অনেক কারণের মধ্যে একটি মূল কারণ, তারা আন্তর্জাতিকতাবাদ দ্বারা এত আচ্ছন্ন ছিল যে, জাতীয়তাবাদকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমান তখন অনেকটাই আÍপ্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। তারা ক্ষমতা চায় এবং এই ক্ষমতা লাভের পথে বাংলার অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ ছিল একটি মোক্ষম অস্ত্র। তাই তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে, স্লোগানে এই জাতীয়তার কথা নিনাদিত হয়েছে। কিন্তু এই সেকুলার জাতীয়তাবাদকে তারা আÍস্থ করতে পারেনি এবং ক্ষমতা দখলে স্লোগান হিসেবে ব্যবহার এবং রাষ্ট্রাদর্শ হিসেবে কেতাবে ব্যবহার করা ছাড়া জাতীয় জীবনে তার মর্মার্থ প্রতিষ্ঠার কোন উদ্যোগ নিতে পারেনি। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ক্ষমতা হাতে পেয়েই নিুœমধ্যবিত্তের হীনমন্য চরিত্রের বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমান একটি নীতি ও নৈতিকতাচ্যুত লুটেরা শ্রেণীতে পরিণত হয়। এই শ্রেণী চরিত্রের রোগ জীবাণুর সংক্রমণ থেকে আওয়ামী লীগও মুক্ত থাকতে পারেনি।
স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষিত উদ্দেশ্যগুলোর ভিত্তি শক্তিশালী করার ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ যথাসময়ে গ্রহণ না করলে যা হয়, মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় একাত্তরের পরাজিত শক্তি জয়ী স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেয় এবং বন্দুকের জোরে পাকিস্তানি ভাবাদর্শের একটি রাষ্ট্রে বাংলাদেশকে পরিণত করার পথে পিছিয়ে নিয়ে যায়। এই প্রতিবিপ্লবী চক্রান্তের সফল নায়ক হিসেবে দেখা দেন ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষকের’ মুখোশধারী জেনারেল জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশেরই একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তুলনা করেছেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ফ্রান্সে হিটলারের তাঁবেদার ভিসি সরকার গঠনের নেতা মার্শাল পেঁতোর সঙ্গে। জিয়াউর রহমানকে যেমন শহীদ আখ্যা দিয়ে ঢাকঢোল পেটানো হয়, মার্শাল পেঁতোকে তেমনি ভার্দুন বিজয়ী বীর বলে ঢাকঢোল পেটানো হতো। আর বর্তমান বাংলায় তো চরিত্রভ্রষ্ট কেঁদো বাঘকেও ‘বঙ্গবীর’ বলে বাদ্য বাজানো হয়।
এই জিয়াউর রহমানই দুর্বল শিকড়ের রাষ্ট্রাদর্শ সেকুলার জাতীয়তাবাদের বিনাশ ঘটান এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নাম দিয়ে সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে নিয়ে যান। স্বাধীনতার পর স্বাধীনতার মূল আদর্শগুলো জনজীবনে গভীরভাবে পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণের বদলে (নিজেরাও সে আদর্শগুলো সম্যক উপলব্ধি করতে না পারায়) রাষ্ট্রক্ষমতায় নিজেদের সংহত ও সুরক্ষিত করার প্রচেষ্টায় আওয়ামী লীগ ব্যস্ত থাকায় অচিরেই তাদের আদর্শিক পরাজয় ঘটে এবং ক্ষমতা থেকে তাদের হটিয়ে দেয়া সম্ভব হয়।
প্রথমে বিশ্বাসঘাতক খোন্দকার মোশতাক এবং পরে ক্ষমতালোভী জিয়াউর রহমানÑ দু’জনেই স্বাধীন বাংলার মূল আদর্শ সেকুলার জাতীয়তাবাদকে কফিনে শুইয়ে সেই কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়ার চেষ্টা করেন। বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের দ্বৈত চরিত্র, আÍপরিচয়ের দ্বন্দ্ব, নীতিহীনতা, দেশপ্রেমবর্জিত আÍস্বার্থপরায়ণতার প্রকাশ এই দুই ব্যক্তির মধ্য দিয়ে স্পষ্টভাবে প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত এমনকি এলিট শ্রেণী এদের সম্পর্কে অনেকটাই সহনশীল। দু’শ বছর আগের মীরজাফর তাদের কাছে দেশদ্রোহী, কিন্তু এ যুগের জিয়াউর রহমান তাদের কাছে শহীদ। দীর্ঘ একুশ বছর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ছিল নৈরাজ্যে। ততদিনে সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসনের পাহারায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে লুটেরা শ্রেণীর বিকাশ ঘটেছে। তারা নিজেদের পাহারা হিসেবে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, মৌলবাদকে দেশে ঘাঁটি গাড়তে দিয়েছে। একদিকে সামরিক অথবা স্বৈরাচারী শাসন ও ধর্মীয় জাতীয়তা, অন্যদিকে অবাধ লুণ্ঠন ও রাষ্ট্র ক্ষমতার অবৈধ ব্যবহার লুটেরা মধ্যবিত্ত শ্রেণী, এমনকি সুবিধাভোগী এলিট ক্লাসেরও নিরঙ্কুুশ রাজত্ব প্রতিষ্ঠা সহজ করে দেয়। দেশের রাজনীতিতে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় কালচারের প্রাধান্য আবার ফিরে আসে।
এ অবস্থার সংক্রমণ থেকে আওয়ামী লীগও আÍরক্ষা করতে পারেনি। শেখ হাসিনা যখন দলটির নেতৃত্ব নেন, তখন দলটি প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে। হাসিনা-নেতৃত্ব দলটির অস্তিত্ব রক্ষা করে, এমনকি দীর্ঘকাল পর দলটিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতেও সক্ষম হয়। কিন্তু ততদিনে আওয়ামী লীগেও নব্য ধনীদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। দলের প্রগতিশীল বাম অংশ কোণঠাসা অথবা দলছাড়া এবং ডানপন্থী আপসবাদীরা দলে সর্বেসর্বা। তারা বঙ্গবন্ধুর নামটিকে রাজনৈতিক মূলধন করেছে, কিন্তু তার আদর্শ থেকে বহুদূরে সরে এসেছে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সাফল্য এই যে, তিনি দলটিকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিক্রিয়াশীল ডানপন্থী, নব্য ধনীদের কব্জাগত একটি দলে পরিণত হতে দেননি। আবার তার ব্যর্থতা এই যে, দলটির যুগোপযোগী সংস্কার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সংস্কারের নামে তিনি পিছিয়েছেন। স্বাধীনতার মৌলিক আদর্শ রক্ষার ক্ষেত্রে দলটা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে আপসের স্বার্থে যতটা পিছিয়েছে, সেখান থেকে তার ফিরে আসা কষ্টকর।
গত ২৩ জুন আওয়ামী লীগ ৬৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছে। এই দলটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সামনে অপেক্ষা করছে। শেখ হাসিনা এই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবেলা করতে পারেন কিনা, তার ওপর দলটির এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
লন্ডন ২৪ জুন, রোববার, ২০১২
আবদুল গাফফার চৌধুরী এর অন্যান্য লেখা
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
  
Contact: 71 Highview Ave, Toronto, ON, M1N 2H4, Canada, Tel: 416 699 9833, email: info@deshebideshe.com