আরবির মওলানা কুদ্দুস স্যার আর সংস্কৃতের পণ্ডিত প্রফুল্ল স্যার, দুজনে খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দুজনেরই ভাষার ওপর ছিল বড় দখল। ধ্রুপদি ভাষায় তাঁদের ভিত্তি মজবুত ছিল বলে তাঁরা ইংরেজি-বাংলাও খুব ভালো জানতেন। তাঁরা একসঙ্গে দরগাপাড়ার হিজল বিলে মাছ মারতে যেতেন। একজন মাছ না পেলে আরেকজনের মাছে ভাগও বসাতেন। পণ্ডিত মশায় মওলানা সাহেবকে জব্দ করার জন্য একবার বললেন, ‘জানো কুদ্দুস, আমি যদি গোমাংস খাই, তবে আমি বেদের আশ্রয় নিতে পারব, কিন্তু শুয়োরের মাংস খেলে তোমার পরিত্রাণ নেই।’
কুদ্দুস মওলানা ব্রাহ্মণ বন্ধুকে জব্দ করার জন্য বললেন, ‘দেখো, কলিকালে যে শূদ্র রাজা হবে, সে তো দাসীপুত্র চন্দ্রগুপ্ত দেখিয়েই গেছেন। পরে শ্বেতাশ্বারোহী কলকির কথা ভেবে লোকে মাজারে ঘোড়া মানত করা শিখেছে। তোমরা মহাদর্পী ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তাদের দেশছাড়া করলে ঠিকই, কিন্তু এখন যবনের সঙ্গে পাঞ্জা না কষে জন্মভূমি ত্যাগ করছ, সেটি কেমনতর কথা?’
পণ্ডিত মশায় সাফাই দিলেন, ‘ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়েছি ইংরেজেরই মন্ত্র দিয়ে। মহারানি ভিক্টোরিয়া তাঁর প্রজাবৃন্দের প্রতি ধর্ম নিয়ে ব্যত্যয় ঘটাননি। এরপর ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতে আপিসে-আদালতে লোকের মধ্যে ফারাক করলে আমরা কোন সাহসে দেশে থাকব! প্রতিবেশী যখন অচেনা হয়ে যায়, তখন কার ভরসায় নিশ্চিন্ত হব বলো। আমি বলি, আমার অল্পবিস্তর যা জমিজায়গা আছে, তুমি তোমার হিসাবের দরে কিনে নাও। পরে দেশের টানে যদি বেড়াতে আসি, আমি তোমার বাড়িতেই উঠব।’
মওলানা সাহেব বললেন, ‘তোমার বসতবাড়ি কিনে সেখানে বাস করলে আমার যে হাঁফ ধরবে, সে ফাঁপরে আমি পড়তে চাই না। দেশ যখন ভাঙে আর দেশ যখন গড়ে তখন ব্যবসায়ীদের বারোপোয়া। শুনছি, সাহারা দেদারছে জমিজমা কেনাকাটা করছে। তোমাকে যাতে সাহা বা শেখদের কাছে জলের দামে জমি বিক্রি করতে না হয়, আমি সেদিকে দেখব। আমি তোমার পাশেই আছি। আর দেশে যদি আসো, তুমি সোজা আমার বাড়িতে থাকবে। তুমি সংস্কৃতর পণ্ডিত। আশা করি, তোমাকে কোনো প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না। দেব-দেবীরা তোমাকে সব সময় আশকারা দেবে এবং বেদ-বেদান্ত তোমাকে প্রশ্রয় দেবে।’
পণ্ডিত মশায় জমিজায়গা বিক্রি করে দেশান্তরী হলেন। সংস্কৃত পড়ার জন্য ছাত্রও আসে না, পণ্ডিতও মেলা ভার। আমাদের ইংরেজির স্যার সংস্কৃত পড়ানোর অতিরিক্ত কাজ নিজের ঘাড়ে নিলেন। স্কুলের হেড মাস্টার এ জন্য তাঁকে বাহবা দিলেন।
হেড মাস্টারমশাই বলতেন, এ তল্লাটে বেশির ভাগই হীনযান বৌদ্ধ। মহাজন বৌদ্ধ বা হিন্দুদের মতো তাদের সংস্কৃত ভাষার তেমন প্রয়োজন নেই। তাদের প্রয়োজন রয়েছে পালি ভাষা।
হেড মাস্টার মশাই দেশত্যাগ করার কথা চিন্তা করেননি। স্কুলের কর্মকাণ্ড কীভাবে প্রসার ও উন্নয়ন করা যায়, সেই দিকে ছিল তাঁর চিন্তা। স্কুলে পালি ভাষা পড়ানোর কথা তিনি বহুদিন থেকে চিন্তা করতেন। তিনি বলতেন, আজকাল ভিক্ষুরা বিদ্যা দান করতে চান না। তাঁরা যক্ষের মতো পিটকাদি রক্ষা করেন। তাঁরা খেয়াল করেন না, দৈব-দুর্বিপাকে, ঝড়-বৃষ্টিতে, খাণ্ডবানল বা যবানলে সেই সব শাস্ত্র অকসাৎ ভস্মীভূত হয়ে যেতে পারে। পাঠ-পঠন না করে গেরুয়া বস্ত্রে শাস্ত্রাদি বেঁধে রাখলেই কি চলবে?
আমাদের ইংরেজি স্যার সাহেবদের মতো ইংরেজি উচ্চারণ করার চেষ্টা করেন। তিনি ‘টিএইচই’কে ‘দ্য’ বলেন, ‘অফ’কে ‘অব’ বলেন এবং ‘আর’-এর উচ্চারণ প্রায় করেনই না। আমরা গার্ল্ বলি, উনি গার্ল বলেন, কোনো কোনো সময় গ্যের্রল্ও বলেন। আমাদের বড় প্রিয় স্যার। স্যার স্বাভাবিকভাবেই হিন্দুপাড়ায় বাস করেন। সেখানে সন্ধ্যায় শাঁখের ডাক, ধূপের গন্ধ পাওয়া যায়। আমাদের পাড়ায় প্রহর গুনে মোরগ বাঁক দেয়। মিলাদের সময় কেওড়া বা গোলাপপানির খোশবু ও আগরবাতির গন্ধ পাওয়া যায়। মশা তাড়াতে দুই পাড়াতেই সাঁজাল দেওয়া হয়। আমার সাঁঝের মায়ার প্রতি বড় দুর্বলতা ছিল। আজকাল শঙ্খের আওয়াজ তেমন শোনা যায় না। ধূপের গন্ধও হালকা-পাতলা হয়ে গেছে।
একদিন স্যার বেশ খোশমেজাজে ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘জানিস, আমাদের খোল-করতালে কী কথা বলে? প্রথমে খোলে আঁচড় দিলে তা বিড়বিড় করে বলে, “চিঁড়া আন, চিড়া আন।” কয়েকবার এভাবে মৃদু কণ্ঠে ডেকে খোল হঠাৎ আওয়াজ তুলে বলে, “দে দই, দে দই।” কিছুক্ষণ পর মন্দিরা বলে, “মাখিচুখি, মাখিচুখি।” আরও কিছুক্ষণ পর করতাল তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আওয়াজ করে, “খাইখাই, খাইখাই”।’ এরপর স্যার হেসে বললেন, ‘যা, আজকে তোর কাছে ঘরের অনেক কথা ফাঁস করে দিলাম।’ আমি না হেসে গম্ভীর মুখ করে সেখান থেকে সরে বাড়ি ফেরার পরে দারুণ হাসলাম। চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘দে দই, দে দই।’
একবার বন্যার সময় আমরা চার-পাঁচজন স্যারের সঙ্গে ত্রাণকাজের জন্য কাছেই কয়েকটা গ্রামে গেলাম। ফেরার সময় নৌকায় স্যার ও আমি ছিলাম। স্যারের বাড়ি পৌঁছালে দেখি, গুরুমা সহাস্যে দাঁড়িয়ে আছেন। দুপুর গড়িয়ে গেছে। স্যার হঠাৎ বেখেয়ালে বলে ফেলেন, ‘তুমি আমাদের সঙ্গে না হয় খেয়েই যাও।’ আমি দেখলাম, গুরুমার মুখটা কেমন যেন থতমত হয়ে গেছে। দ্রুত উত্তর দিলাম, ‘আমার জন্য মা অপেক্ষা করছে।’ ইতিমধ্যে স্যারের হুঁশ হয়েছে। তিনি ও গুরুমা একসঙ্গে যেন হাঁফ ছেড়ে বলে উঠলেন, ‘আচ্ছা, আচ্ছা।’
বাড়ি ফেরার সময় সারাটা পথ স্যারের প্রতি শ্রদ্ধায় আমার মনটা ভরে উঠল। কাঁদতে পারলে যেন ভালো হতো, কিন্তু স্যার আদেখলা-আদুরি কান্নার কথা মনে হলে বলতেন, ‘কাঁদি কাঁদি মন করছে, কেঁদে না আত্তি মিটছে, রাজাদের হাতি মরছে, তার গলা ধরে কেঁদে আসি।’ এবার খুব হাসি পেল। মনটা ফুরফুরে হয়ে গেল, স্যার বেখেয়ালে বড় স্নেহ করে বলে ফেলেছিলেন, ‘আমাদের সাথে না হয় খেয়েই যাও।’
মাস্টারমশায়ের মেয়ে মায়া আমার বড় নেওটা হলেও দূরে দূরে থেকে আদর নিত। পাড়ায় বানের জল এলেই মায়ার আব্দার ছিল যে আমি তার জন্য এক লাল ফড়িং ধরে দিই। আমি লাল ফড়িং ধরলাম কিন্তু তার একপা’ ডানা ছিঁড়ে গেছিল। মায়াকে ফড়িংটা দিলে সে সেটা কাছে একটা ঝোপের ডালে রেখে দিয়ে বলল, ‘যা তাড়াতাড়ি ভালো হ।’ আমরা একটু অমনোযোগী হয়েছি, অমনি কোত্থেকে একটা পাখি এসে ছোঁ মেরে ফড়িংটা নিয়ে গেল। সেই দেখে মায়ার কী কান্না! সে বারবার বলল, ‘দাদা, আমি আর কোনো দিন তোমাকে ফড়িং ধরতে বলব না।’
এর পরই মায়া তাড়স জ্বরে পড়ে এবং তিন দিনের মাথায় সে মারা যায়। এই শুনে আমি দুই-তিন দিন মায়াদের বাড়ি যাইনি। যেদিন ওদের বাড়িতে গেলাম, সেদিন গুরুমা বললেন, ‘জানো, মায়া জ্বরের তাড়সে বারবার বলেছে, “দাদা, তোমাকে আর কোনো দিন ফড়িং ধরতে বলব না”।’ এ কথা বলেই তার মা-বাবা দুজনেই কেঁদে ফেলেন। মা বললেন, ‘মায়া তোমাকে খু-উ-ব ভালো...।’ আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না। কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে পালিয়ে আসি দরগাপাড়ার হিজল বিলের কাছে। সেখানে কয়েকটি ঢিল জোগাড় করে একের পর এক আমি বিলের মাঝে ফেলতে লাগলাম। পানিতে তরঙ্গ ভঙ্গ দেখে মনটা কিছুটা শান্ত হলো।
মায়া তিন দিনের জ্বরে হঠাৎ মারা গেলে মাস্টার মশায় কেমন যেন হয়ে গেলেন। প্রায় সারাটা বছর কন্যা-হারানোর শোকটা যেন পাষাণ হয়ে জমে থাকত। মহালয়ার ঢাক বাজতেই তাঁর মনে ফিরে আসত কন্যার কথা। আর দশমীর দিন বিসর্জনের পরে সে কী কান্না! ভাবতে অবাক লাগত, মাটির তৈরি একটা বড় পুতুল জলে ফেলে দিলে এত কান্না কেন? ও কি অলৌকিক কিছু ছিল? লোকে বলত, মা দুর্গা নিজে নিজে জলে পড়ে যেতেন। আসলে যে দড়িতে দুর্গাকে নৌকায় টেনে বেঁধে রাখা হতো, সেই দড়িটা বিসর্জনের জায়গায় ধারালো ছুরিতে কেটে ফেললে মূর্তিটা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ঢলে পড়ে যেত। এই বিসর্জনের সময় মাস্টার মশায় দেবী দুর্গাকে নিজের কন্যা মায়ার মতোই মেনে নিতেন।
বিসর্জনের পর তিনি যেভাবে কাঁদতেন, তা চোখে দেখতে পারতাম না। সহ্য হতো না। ছুটে বাড়ি পালিয়ে যেতাম।
মাস্টার মশায় আরেকবার চণ্ডীমণ্ডপে কাঁদতেন। শ্রীচৈতন্যের জন্ম দিবসে হেসেখেলে হরে কেষ্ট ডাকতে ডাকতে উদ্বাহু হয়ে আবেগে কেঁদে ফেলতেন। চৈতন্যের গত জন্মদিবসে তিনি এতই উল্লসিত হয়ে নেচেছিলেন, জ্ঞান হারিয়ে সেই যে পড়ে গেলেন আর উঠতে পারলেন না।
মাস্টার মশায় দেহত্যাগ করার পর তাঁর নিকটাত্মীয় কেউ কাছেভিতে না থাকায় গুরুমা ঠিক করলেন, আত্মীয়দের সঙ্গে কাশীতে গিয়ে বাস করবেন। যেদিন তিনি যাচ্ছেন, আমি তাঁর বাসায় গিয়ে দাঁড়ালাম। খাঁ খাঁ করা এক বিসর্জন-বিসর্জন ভাব। আমার মনটা হাহাকার দিয়ে উঠল, কিন্তু কেন জানি আমি কাঁদতে পারলাম না, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।
বিদায় নেওয়ার সময় সালাম করতে গেলে গুরু-গিন্নি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ভালো করে লেখাপড়া করিস। শরীরের দিকে যত্ন নিস।’ তারপর আমার হাতে একটা সিকি ধরিয়ে দিয়ে কেঁদে ফেললেন।
তখন সবচেয়ে বড় একটা রসগোল্লা এক পয়সার পাওয়া যেত। একসঙ্গে কিনলে সিকিতে ষোলোটা, তার ওপর দু-একটা রসগোল্লা ফাউও মিলত।
সেই ঘষে যাওয়া সিকিটা আমি কোনো দিন খরচ করতে চাইনি। জেনে-শুনে খরচও করিনি। কবে, কোথায় খরচ হয়ে গেছে বা হারিয়ে গেছে, আমার জানা নেই। সেই সিকিটা এখনো অব্যয় হয়ে আমার স্মৃতিতে বেঁচে আছে।