বিশ্বের দরবারে স্বাধীন বাংলাদেশ কে প্রতিষ্টিত করতে বাংলার সাধারণ মানুষের কত যে ত্যাগ, জানি তার সীমা পরিসীমা নেই। ইতিহাসে পাতায় হয়ত তাদের ত্যাগের কথা সেভাবে উঠে আসবে না । মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে সরকারী কোন তালিকায় তাদের নামের আগে কোন ক্রমিক নম্বর হয়ত পরবে না । ইচ্ছা আর তাগিদের অভাবে তারা চির তরে হারিয়ে যাবেন লোক্ষ চক্ষুর আড়ালে । আর এভাবেই হয়ত পৃথিবীর বুকে রক্ষিত হতে থাকবে বাঙালী জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস । একটি বিরাট অংশের অনুপস্থিতিতে!
মুক্তিযুদ্ধে চরম ত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। আমরা ৪১ বৎসর পার করেছি, কিনÍু আমরা পারলাম না এখনও আমাদের তৃণমূল পর্যায়ে গণ- মানুষের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস রচনা করতে , পারলাম না পূণাঙ্গ একটি মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরী করতে । পারলাম না নারী মুক্তিযোদ্ধা( বীরঙ্গনা) দের রাস্ট্রিয় ভাবে স্বীকৃতি দিতে ! কিন্তুু মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারদেরকে কেন্দ্র করে নামী -দামী সংগঠনের তো অভাব নেই এ সমাজে ! জনগণের অতন্দ্র প্রহরী হবার আস্বাস দিয়ে এসকল সংগঠন আজ সম্পদে- ক্ষমতায় সমাজে প্রতিস্টা পেয়েছে শক্তিধর প্রতিষ্টান হিসাবে ।
কিন্তুু , তারপর ও বাস্তবতা হল ,বাংলার আনাচে – কানাচে রয়ে যাওয়া অনেক মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারে সন্ধান আমরা পাই বড্ড করুন বাস্তবতায়। এমনই একটি চিত্র শহীদ আঙ্গুরার পরিবার। গত ১৬ অক্টোবর শহীদ আঙ্গুরার জননী ছাফিদা খাতুন আমাদের ছেড়ে চলে গেলে । (ইন্না লিল্লাহী..) বড় নিরবে চলে যেতে হলো তাকে । ৭৪ বৎসর বয়সী আঙ্গুরার মা ছফিনা খাতুন সব-সময় প্রতিক্ষায় ছিলেন তার শহীদ সন্তান আঙ্গুরার নাম টি শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় আসার । স্বীকৃতি পাবে রাস্ট্রিয় মর্যাদায় । বৃদ্ধা আঙ্গুরার মা বয়সের বারে নতজানু হলে ও তার মেয়ের মুত্যুর দিনটির কথা ভুলতে পারেনি তিনি কোনদিন । যখনই যেতাম তার বাড়িতে, এক খিলি পান হাতে ধরিয়ে বলতে চাইতেন তার স্বৃতিপটে থাকা আঙ্গুরাকে নিয়ে কস্টের অনুভুতি গুলোর কথা ।
হবিগঞ্জ জেলা হতে শিবগঞ্জ বাজারের পাশ ধরে হলদারপুর গ্রামের উদ্দেশ্যে হাটতে থাকলে বিশ মিনিটের পথ, ছোট রাস্তার উপরে আবস্থিত হলদারপুর গ্রামে পূর্ব বাড়িটি শহীদ আঙ্গুরার বাড়ি , ঠিক বাড়ি বলা চলে না মাটির উচু ভিঠায় বাসের দাফনা (বেড়ার) আর শনের ছাউনি । তাতে দুটি ছোট ছোট ঘর , তা ও আবার ভাঙ্গা। সেখানেই বাস করতেন আঙ্গুরার বৃদ্ধ পিতা-মাতা । আঙ্গুরার পিতা আব্দুল মালিক মিয়ার ছয় ছেলে- মেয়ে। সকলের বড় ছিলেন আঙ্গুরা। ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল মাত্র ১২ বৎসর। একই গ্রামের কালাবাড়িতে কা¦রি কাদির মিয়ার কাছে আঙ্গুরা কুরআনে ছবক নিয়ে ছিলেন মাত্র দু, মাস আগে । রোজ বাদ-যোহর মক্তবে পড়তে যেতেন আঙ্গুরা তার সহপাটিদের নিয়ে । ৭১ সালের ১৯ এপ্রিল যোহরে নামাজের পর মায়ের হাতে শেষ ভাত খেয়ে যথারীতি পড়তে গিয়েছিলেন আঙ্গুরা কালাবাড়ির মক্তবে। আর সেই দিনই হলদারপুর গ্রামে আচমকা আক্রমনে বিমান সেলিং এ নিহত হন আঙ্গুরা সহ নয়জন।তচনচ হয় গোটা গ্রাম। সেইদিন নিজেকে বাচাতে আঙ্গুরা আশ্রয় নিয়েছিলেন মক্তবের পাশে সামাদ লন্ডনীর টিনের ঘরে । তার সাথে তারই সহপাটি ফরিজা ও আশ্রয় নিয়েছিলেন সামাদ লন্ডনীর বাড়িতে , ৭১ সালের ১৯ এপ্রিল বিমান সেলিং এ আহত আঙ্গুরার সহপাঠি ফরিজা বলেন ”আঙ্গুরা বড় সুন্দর মাইয়্যা আছিল, আমরা হিদিন( ৭১সালের ১৯ এপ্রিল) সাবেদ লন্ডনীর বাড়িত ফালঙ্গের নিচে লোকাইছলাম ,বাছবার আশায়। আখ্তা দেখি, আঙ্গুরার নাখে, মুখে রক্ত আর রক্ত। মাথার মধ্যে গুলি লাইগ্যা আঙ্গুরা চৌক্ষের সামনে ম্যইরা গেল আর আমি হইলাম ছির ফঙ্গু ।”
ফরিজা কিছুক্ষন নিশ্চুপ রইলেন, যেন বলতে পারছেন না । তারপর আবার ও বললেন, আমি ত দুন্যাইয়্যার উপর ব্যাইচা আছি , দেখছি আঙ্গুরার মা-বাপরে কত কষ্ট করতে, হারা জীবন মানুষের বাড়িত খামলা দিলো ,বাড়ি ঘর নাই, ছাফট্যা দিয় া রইল । আইজ বুরা বেটি মইরা গেল ,অতচ বেটির আশা পূরন হইল না । আর কী অইবো গো... ?”
আঙ্গুরা মা- বাবা দুজনেই ৭০ উধ্ব বয়স। কিন্তুু ভাগ্যে জুটেনি বয়স্ক ভাতার সুযোগ সুবিধা । মুক্তিযুদ্ধে তাদের বড় সন্তান টি শহীদ হলে ও আসেনি তার কোন রাষ্ট্রিয় স্বীকৃতি । পাননি শহীদ পরিবারের সম্মান । ৪১ বৎসরে বাংলাদেশ কত এগিয়ে গেছে , মুক্তিযোদ্ধাদের আধিকার রক্ষায় সৃস্টি হয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রনালয়। ক্ষমতায়, সম্পদে বিশাল শক্তিশালী সংগটন মুক্তিযোদ্ধা কল্যান ট্রাস্ট, সমাজসেবায় কত কর্মসূচি ! কিন্তুু তাতে কী ? এত এত পরিবর্তনের মধ্যেও শহীদ আঙ্গুরার দরিদ্র বৃদ্ধ পিতা-মাতার সংগ্রামী জীবনের তো কোন হের-ফের হয়নি। আঙ্গুরার বৃদ্ধা মা নিরবে চলে গেলেন ,না ফেরার দেশে । আর নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ পিতা আব্দুল মালিক ৮৫ বছর বয়সে কংকাল সার শরীর নিয়ে কাচি অথবা কুদাল হাতে আজও অন্যের বাড়িতে যান কাজের আশায় ,কামলা দিতে । এ লজ্জা রাখি কোথায় ?
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ৪১ বছর পর এটিই গ্রাম-বাংলায় মুক্তিযোদ্ধাদের বড় একটি অংশের প্রকৃত চিত্র । এখন ও কী আমরা কারো অপেক্ষায় থাকবো ,নাকি নিজ নিজ সামর্থ্য থেকে কিছু করার উদ্যেগ নিবো এ সকল নিঃস্ব মানুষ গুলোর জন্য ? এটাই হোক বিবেকের কাছে প্রশ্ন ।