নিউইয়র্ক, ৫ অক্টোবর ২০১২- নিউইয়র্ক তথা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশীদের ‘মাদার সংগঠন’ আর ‘বাংলাদেশের মিনি পার্লামেন্ট’ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ সোসাইটি ইন্্ক নিউইয়র্কের দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন আগামী ৭ অক্টোবর রোববার। এই দিন কুইন্স আর ব্রুকলীন এই দু‘টি কেন্দ্রে সোসাইটির নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত একটানা ভোট গ্রহন চলবে। এবারের নির্বাচনে ‘কামাল-রহিম’ ও ‘জাহাঙ্গীর-রফিক’ পরিষদ সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সোসাইটির ১৯ সদস্যের কার্যকরী পরিষদের এই নির্বাচনে দুই পরিষদ থেকে ১৯ জন করে মোট ৩৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। নির্বাচনকে ঘিরে ফোন কলের মাধ্যমে চলছে সর্বশেষ প্রচার-প্রচারণা। সেই সাথে চলছে সামাজিক গণমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা, ভোট আর দোয়া প্রার্থণা। অপরদিকে চলছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। প্রতিদ্বন্দ্বি দুই প্যানেলের প্রার্থীদের রং বে রং এর ব্যানার পোস্টারে ছেয়ে গেছে বাংলাদেশী অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, ব্রুকলীন, ব্রঙ্কস, ওজনপার্ক প্রভৃতি এলাকা। সোসাইটির এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা হচ্ছে ৫ হাজার ২৯৩জন। এরমধ্যে আজীবন সদস্য (ভোটার) রয়েছেন ২২৫ জন। সুষ্ঠুভাবে ভোট সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ নূরুল হক।
পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচন কমিশনের আন্যান্য সদস্যরা হচ্ছেন: মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, মফিজুর রহমান, আজিমুর রহমান বুরহান ও মোহাম্মদ শাহ আলম। এদিকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর রোববার সিটির উডসাইডস্থ গুলশান ট্যারেসে ‘জাহাঙ্গীর-রফিক’ পরিষদের এবং ১ অক্টোবর ওজনপার্কের আল মদিনা রেষ্টুরেন্টে ‘কামাল-রহিম’ পরিষদের সর্বশেষ প্যানেল পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সোসাইটির নির্বাচন কমিশন বার্তা সংস্থা ইউএনএ প্রতিনিধিকে জানিয়েছে, এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ আর নিরপেক্ষ করতে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নির্বাচনে কুইন্স আর ব্রুকলীনে দুটি কেন্দ্র থেকে ভোট গ্রহণ করা হবে। কুইন্সের ভোট কেন্দ্র হচ্ছে কুইন্স ভোকেশনাল হাই স্কুল (৩৭-০২, ৪৭ এভিনিউ)। আর ব্রুকলীনের কেন্দ্র হচ্ছে পিএস ২১৪ (২৯৪৪ পিটকিন এভিনিউ)। কেন্দ্র দু’টিতে ২৪টি ভোটিং মেশিন ব্যবহার করা হবে। এরমধ্যে কুইন্স কেন্দ্রে ব্যবহৃত হবে ১৮টি মেশিন আর ব্রুকলীন কেন্দ্রে ব্যবহৃত হবে ৬টি মেশিন। কুইন্স কেন্দ্রের ভোটার হচ্ছে ৪০৩০ আর ব্রুকলীন কেন্দ্রের ভোটার হচ্ছে ১২৬৩ জন। উভয় কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শেষে কুইন্স কেন্দ্র থেকে চুড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে। ভ্যালিড আইডি ছাড়া কেউ ভোট দিতে পারবেন না।
সোসাইটির আসন্ন নির্বাচনে ‘কামাল-রহিম’ পরিষদ থেকে কমিউনিটির পরিচিত মুখ, জালালাবাদ এসোসিয়েশন অব আমেরিকা ও বিয়ানীবাজার সামামাজিক ও সাস্কৃতিক সমিতির দুই দুইবারের নির্বাচিত সাবেক সভাপতি কামাল আহমেদ সভাপতি এবং সোসাইটির বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, জ্যাকসন হাইটস মসজিদ ও জ্যাকসন হাইটস বাংলাদেশী বিজনেস এসোসিয়েশন (জেবিবিএ) সহ কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠনের সাথে জড়িত আব্দুর রহিম হাওলাদার সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অপরদিকে ‘জাহাঙ্গীর-রফিক’ পরিষদ থেকে বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সংগঠক জাহাঙ্গীর সরকার ওরফে এস এম জাহাঙ্গীর সভাপতি এবং কমিউনিটির পরিচিত মুখ, বিশিষ্ট সংগঠক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই পরিষদের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন সোসাইটির সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাসির আলী খান পল আর সদস্য সচিব হচ্ছেন মৌলভীবাজার জেলা সমিতির সভাপতি মিনহাজ আহমেদ সাম্মু।
বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে ‘আমরা নিষ্ঠা, সততা ও ঐক্যে বিশ্বাসী’ শ্লোগান নিয়ে ৮ দফা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ‘কামাল-রহিম’ পরিষদ। অপরদিকে ‘সৃজনশীল, যোগ্য, সৎ, গতিশীল ও নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশায়’ এবং ‘সোসাইটির সেবা-কল্যাণের জন্য, জাহাঙ্গীর-রফিক পরিষদের বিকল্প নাই অন্য’ শ্লোগান নিয়ে ১০ দফা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ‘জাহাঙ্গীর-রফিক’ পরিষদ। এই পরিষদের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন সোসাইটির সাবেক সভাপতি আকতার হোসেন আর সদস্য সচিব হচ্ছেন চট্টগ্রাম এসোসিয়েশন অব আমেরিকার সভাপতি কাজী সাখাওয়াত হোসেন আযম।
‘কামাল-রহিম’ পরিষদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি
‘কামাল-রহিম’ পরিষদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে স্থায়ী শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠায় কমিউনিটি ও কর্তৃপক্ষের সাথে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ, জবের জন্য তথ্য সংগ্রহ, করে কমিউনিটিকে সার্বক্ষণিক সহযোগীতা প্রদান, বাংলাদেশী কমিউনিটিকে মূল ধারায় সম্পৃক্ত করার জন্য মেলবন্ধন তৈরী করা, বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় করার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন, সিটি ও স্টেট থেকে কমিউনিটির জন্য বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা আদায়ের উদ্যোগ গ্রহণ, বাংলাদেশ ডে উপলক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে প্যারেড এর আয়োজন করা, নব প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীকে বাংলাদেশী কৃষ্টি সংস্কৃতি শিক্ষাদান ও বাংলা স্কুলের কার্যক্রম আরও জোরদার করা।
‘জাহাঙ্গীর-রফিক’ পরিষদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি
অপরদিকে ‘জাহাঙ্গীর-রফিক’ পরিষদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে প্রবাসীদের কল্যাণ এবং অধিকার প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারায় বাংলাদেশীদের সম্পৃক্ত করার বাস্তবমূখী পদক্ষেপ গ্রহণ, বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য ফেডারেল, ষ্টেট ও সিটি প্রশাসন থেকে চাকুরী, বাসস্থান, চিকিৎসা ও ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত যাবতীয় সুযোগ সুবিধা আদায়, স্পোকেন ইংলিশ, কম্পিউটার ট্রেনিং এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষাকে (স্প্যানিশ ভাষার মতো) দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে আদায় করে নিতে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ, প্রবাসের গড়ে ওঠা সকল আঞ্চলিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ‘প্রবাসী কল্যাণ ফান্ড’ নামে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করার ব্যাপারে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাংলাদেশ কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ, কমিউনিটির মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক বৃত্তি প্রদান চালু করা, প্রবাসী বাংলাদেশী নাগরিকদের বাংলাদেশে স্থায়ী রেসিডেন্সীসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য সরকারের সাথে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া ও জাতীয় পতাকাবাহী বাংলাদেশ বিমানের ঢাকা-নিউইয়র্ক-ঢাকা রুট পুনরায় চালু করার ব্যাপারেও সর্বাত্বক প্রচেষ্টা চালানো, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্গত মানুষের সেবা ও কল্যানে গ্লোবাল ওয়ারমিং ও বাংলাদেশের আর্সেনিকযুক্ত পানি সংকট নিরসনে জাতিসংঘসহ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে জোরালো লবিং এর মাধ্যমে উদ্যোগ গ্রহণ এবং দেশের সকল জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সহযোগিতা করা, আমেরিকায় নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘বাংলাদেশ লাইব্রেরী‘ প্রতিষ্ঠার কর্মসূচী গ্রহণ, সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশ সম্মেলনসহ সকল জাতীয় অনুষ্ঠান ও নিউইয়র্কে বাংলাদেশ প্যারেড আয়োজনে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ, অনলাইনে সদস্যপদ সংগ্রহ সহ সকল বাংলাদেশীদের জন্য সোসাইটির সদস্য পদ গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজতর করা ও সদস্য পদ সবসময়ের জন্য বহাল রাখার ব্যবস্থাসহ সোসাইটিকে আধুনিকায়ন করা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও সময়ের প্রয়োজনে সোসাইটির গঠনতন্ত্রকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সঙ্গতিপূর্ণ করা। নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে রেষ্টুরেন্ট, আড্ডাস্থল সর্বত্রই সোসাইটির নির্বাচন নিয়ে চলছে আলোচনা, জল্পনা, কল্পনা। তবে অনেকের মুখেই এক কথা ‘আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশী তাকে দেবো’। এখন প্রতিক্ষার পালা শেষ হাসিটি কোন প্যানেল হাসে তা দেখার জন্য।