ভারতের রাজধানী দিল্লির বুকে সোমবার বিশাল সমাবেশ করে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দিলেন, তাকে কোনভাবেই দাবিয়ে রাখা যাবে না। সাধারণ মানুষের পক্ষে তিনি তার লড়াই জারি রাখবেন। ইউপিএ সরকারের জনবিরোধী নীতির তীব্র সমালোচনা করতে গিয়ে মনমোহন সিংয়ের সরকারকে রক্তচোষকের সরকার বলে অভিহিত করেছেন মমতা। সেই সঙ্গে তিনি বলেছেন, এই সরকার আর একদিনের জন্য থাকুক- সেটা আমরা চাই না। তাই প্রয়োজন হলে এই সরকারের বিরুদ্ধে সংসদে অনাস্থা আনতেও তৃণমূল কংগ্রেস পিছপা হবে না। এদিন ঐতিহাসিক যন্তরমন্তরে কয়েক হাজার মানুষের সমাবেশে দাঁড়িয়ে মমতা জানান, এই সরকার একের পর এক জনবিরোধী নীতি নিয়ে চলেছে। সাধারণ মানুষের স্বার্থে এই সরকার একটিও নীতি গ্রহণ করেনি। ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে সরকার পাশ্চাত্যের করপোরেট জায়েন্টদের কাছে দেশকে বিক্রি করে দিচ্ছে। মনমোহন সিংয়ের সরকারের শরিকদের না জানিয়ে খুচরো ব্যবসায় প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের দরজা খুলে দেয়া এবং রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি চালু করার প্রতিবাদে তৃণমূল কংগ্রেস ইউপিএ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এর পর থেকেই সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে মমতা দেশব্যাপী আন্দোলন সংগঠিত করতে নেমে পড়েছেন। আর তার এই আন্দোলনে তিনি সমাজবাদী পার্টির নেতা মুলায়ম সিং যাদবসহ অন্যান্য দলের সমর্থন চেয়েছেন। তবে তৃণমূল কংগ্রেস কোন অবস্থাতেই বিজেপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের সঙ্গে যাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায়। এদিন মমতা জানান, দিল্লিতে ফের ১৯-২০শে নভেম্বর তিনি ফের ৪৮ ঘণ্টার জন্য ধরনায় বসবেন। উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌতেও মমতা ধরনা বিক্ষোভ সংগঠিত করবেন। আর সেই আন্দোলনে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবকেও যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মমতা এদিন অভিযোগ করেন, যারাই সরকারের জনবিরোধী নীতির সমালোচনা করছে, তাদেরই ইউপিএ সরকার গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআইকে দিয়ে মুখ বন্ধ করার পথ নিয়েছে। তবে মমতা এজন্য মোটেই ভীত নন জানিয়ে বলেছেন, আমি সাধারণ মানুষের স্বার্থে জেলে যেতেও রাজি। এদিনের ধরনা সমাবেশে সংযুক্ত জনতা দলের প্রধান শারদ যাদব পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে ‘আসল বাঘিনী’ বলে উল্লেখ করে বলেন, ইউপিএ সরকারের এফডিআই নীতির বিরুদ্ধে মমতার লড়াইকে আমরা সমর্থন জানাচ্ছি। যাদব আরও বলেন, সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষায় মমতা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সরকারের জনবিরোধী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মমতা তার ফেসবুকেও লড়াই জারি রেখেছেন। তিনি দেশের নতুন প্রজন্মকে তাই এই এফডিআইবিরোধী আন্দোলনে সামিল হওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে কলকাতায় কংগ্রেস ও সিপিআইএম আলাদা আলাদা দু’টি মিছিল ও সমাবেশ করে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শাণিয়েছে। সিপিআইএমের ডাকা সমাবেশে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষের জমায়েত হয়েছিল রানি রাসমণি এভিনিউয়ে। সিপিআইএমএ’র এই সমাবেশ থেকে উঠে এসেছে রাজ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বার্তা। তবে একযোগে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন সিপিআইএম নেতারা। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিদিনই নারীর ওপর অত্যাচার বাড়ছে। কিন্তু এ বিষয়ে রাজ্য সরকার নির্বিকার থাকায় সমাজবিরোধীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে গোটা রাজ্যজুড়ে চাষিদের খারাপ অবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। অনাহার ও কৃষক আত্মহত্যার প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকার এসব বিষয়ে নজর দিচ্ছে না। কেন্দ্রীয় সরকারের জনবিরোধী নীতির প্রতিবাদে বাম দলগুলো একসঙ্গে লড়াই করবে বলে এদিনের সমাবেশে জানানো হয়। অন্যদিকে প্রদেশ কংগ্রেসের নেতারা রাজ্য সরকার থেকে বেরিয়ে আসার পর সরকারের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা শুরু করেছেন। এদিনের মিছিলেও ছিল সেই ক্ষোভের প্রকাশ।