লন্ডন, ৫ সেপ্টে"র - লন্ডনের মেঘলা আকাশের দিকে সকলেরই চোখ। আকাশের টসটসে মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বে কখন জানি পূর্ব লন্ডনের আলতাব আলী পার্কের সবুজ ঘাসে। শখানেক বাঙালি সংস্কৃতি কর্মী ও কবি আড্ডায় মেতে উঠেছে বৃষ্টি আসার এই মাতামাতিকে উপেক্ষা করে।
২রা সেপ্টেম্বর সকাল এগারোটা বাজে পূর্ব লন্ডনের স্মৃতিঘেরা আলতাব আলী পার্কে। বাংলাদেশ, কানাডা, ইউরোপ ও ব্রিটেনের বিভিন্ন প্রান্ত্ম থেকে তরম্নণ কবি এবং সংস্কৃতিকর্মীদের আগমনে আলতাব আলী পার্কের ঘুম ভেঙেছে। বাঙালিয়ানার রঙবেরঙের পোশাকের বাহার তরম্নণ তরম্নণীদের মনে বাড়তি আনন্দ ঢেলে দিয়েছে। কোনো বিশেষ দিন নয়- তবুও বিশেষত্ব। সংহতি কবিতা পরিষদ আয়োজন করেছে লন্ডনে বাংলা কবিতা উৎসবের। দেশ থেকে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ। আরো এসেছেন কবি মারূফ রায়হান, কবি ওবায়েদ আকাশ, কানাডা থেকে কবি মাসুদ খান। এক গাদা ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে আসলেন সংহতির কবি ইকবাল হোসেন বুলবুল, আবু তাহের, ফারম্নক আহমদ রনি, রেজোয়ান মারম্নফ, আনোয়রম্নল ইসলাম অভিসহ সংহতির কর্মকর্তাবৃন্দ।
কবিতা উৎসবের সূচনা হবের্ যালির মাধ্যমে আলতাব আলী পার্ক থেকে। তাই আলতাব আলী পার্কে এতো কোলাহল। একে একে আসলেন অতিথি কবি নির্মলেন্দু গুণ, ইংরেজ কবি স্টিফেন ওয়াটস, বয়সের ভার ঠেলে লাঠিতে ভর দিয়ে এলেন বর্ষিয়ান সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী। আরো আসলেন টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুতফুর রহমান। নির্মলেন্দু গুণ ও স্টিফেন ওয়াটসকে ঘিরে তরম্নণ কবিদের জটলা নিমেষেই জমে উঠলো পার্কের এক কোণে। আবদুল গাফফার চৌধুরী, কবি নির্মলেন্দু গুণ, ওবায়েদ আকাশ, কবি মারম্নফ রায়হান ও স্টিপেন ওয়াটসকে নিয়ে আড্ডা আর ছবি তোলার ছুটোছুটি চলে পার্কের এপাশ ও পাশের সবুজ ঘাসের মমতাকে জড়িয়ে। কর্মব্যস্ত্ম লন্ডনের নাগরিক গন্ধ গা থেকে এই মাত্র সবাই ছেড়ে ছুড়ে এসেছেন। ভোর রাতের ঘুম সরানো কবিদের প্রাণ খুলে কবি হয়ে যাওয়ার মাদকতায় শুরম্ন হলোর্ যারি উদ্বোধন। এর আগে বাংলা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা আবদুল গাফফার চৌধুরী, মেয়র লুতফুর রহামান, কবি নির্মলেন্দু গুণ ও স্টিফেন ওয়াটসের প্রতিক্রিয়া বাণীবন্ধ করেন।
উৎসবের প্রথম পর্বর্ যালিকে সফল করে তোলার জন্য অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে সংÿিপ্ত বক্তব্য রাখেন সংহতির সভাপতি ইকবাল হোসেন বুলবুল, আবু তাহের ও ফারম্নক আহমদ রনি। তারপর উৎসবের সাফল্য কামনা করে উৎসাহ উদ্দীপনা ছড়িয়ে বক্তব্য রাখেন আবদুল গাফফার চৌধুরী, স্টিফেন ওয়াটস, মেয়র লুতফুর রহমান, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কাউন্সিলার গোলাম রব্বানি, কবি মারম্নফ রায়হান, কবি ওবায়েদ আকাশ, কবি সৈয়দ আল ফারম্নক ও বাংলাদেশ হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টার রাশেদ চৌধুরী। এরপর গাফফার চৌধুরী, স্টিফেন ওয়াটস ও কবি নির্মলেন্দু গুণ রঙিন বেলুন উড়িয়ে বর্ণাঢ্যর্ যালির উদ্ধোধন ঘোষণা করেন। আবদুল গাফফার চৌধুরী ব্রিটিশ মূলস্রোতের কবিদের কাব্যচর্চা ও বাঙালি অনাবাসি কবিদের কাব্যচর্চার মেলবন্ধন রচনা করা এবং নতুন কবিদের কবিতা অনুবাদের মাধ্যমে কাব্যচর্চার কর্মচেষ্টা আদান-প্রদানের জন্য নতুন কবিদের প্রতি আহ্বান জানান। কবি নির্মলেন্দু গুণ যুক্তরাজ্যে বাঙালিদের কাব্যচর্চার সৃষ্টিশীল স্পৃহা দেখে অভিভূত হন।
আনোয়রম্নল ইসলাম অভি ও কবি শামীম শাহানের নির্দেশনায় শুরম্ন হয় বর্ণাঢ্যর্ যালি। আলতাব আলী পার্কের মুখরতা ভেঙে সবাই সারি বাধাঁর জন্য ব্যস্ত্ম হয়ে ওঠে। এতোÿণ যা মিলনমেলায় রূপ নিয়েছিল তা লন্ডনের গুমরোমুখো আকাশের মুখে ছাই দিয়ে গান ধরে গলায় সবাই। বর্ণাঢ্যর্ যালি ব্রিটিশ মূলস্রোতের পথচারিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করের্ যালি শুরম্ন হতেই। ব্যতিক্রমীর্ যালি দেখে তারা চমকে ওঠে। দুধারে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারিরার্ যালির ছবি তুলতে ব্যস্ত্ম হয়ে পড়েন। তাদের কৌতুহল ছিল দেখার মতো। আলতাব আলী পার্ক থেকের্ যালি ব্রিক লেইন হয়ে হ্যানবারি স্ট্রিট কবিদের কোমল পায়ে মাড়িয়ে ব্রাডি আর্ট সেন্টারে শেষ হয়। গানে গানে মুখরিতর্ যালি প্রবাসি বাঙালিদের জন্য বাঙালিয়ানার এক নতুন জাগরণ, নতুন বার্তা- তা-ও কবিদের দ্বারা, কবিতার দ্বারা। কবিতার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানোরএই নতুন চেষ্টাকে পথচারিসহ অংশগ্রহণকারি সবাই উপভোগ করেন ভিন্নভাবে। শুষ্ক লন্ডনের রম্নÿ আবহাওয়াকে অগ্রাহ্য করের্ যালিতে প্রাণদান করেন কবি শহানাজ সুলতানা, মঞ্জুলিকা জামালি, মনিরা পারভীন, কবি আহমেদ ময়েজ, কবি হামিদ মোহাম্মদ, কবি গোলাম কবির, কবি ওয়ালি মাহমুদ সহ তরম্নণ কবি ও সংস্কৃতি কর্মীরা। এছাড়া আরো প্রাণোচ্ছল উপস্থিতি ছিল সাংবাদিক ইসহাক কাজল ও গবেষক ফারম্নক আহমদও কবি মুজিবুল হক মনির।
ইলিয়াস হোসেন বাচ্চু ও ওয়াহিদ জালাল নামের দু'জন কাব্য অনুরাগীর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রূপসীবাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা আবৃত্তির্ যালির সবাইকে মুগ্ধ করে। তারপরর্ যালি শেষ হয় মূল অনুষ্ঠানের আহবানের মধ্য দিয়ে।র্
যালি শেষ হতেই ছুটোছুটি শুরম্ন হয় মূল অনুষ্ঠানের। ১৬ পর্বে আয়োজিত কবিতা উৎসবের মূল অনুষ্ঠানের উদ্ধোধন হয় সংহতির শিল্পী মিতা তাহেরের তত্ত্বাবধানে উদ্ধোধনী সঙ্গীতের মাধ্যমে। এরপর অতিথিদের বরণ করে নেয়া হয়। অতিথির আসন গ্রহণ করেন আবদুল গাফফার চৌধুরী, কবি নির্মলেন্দু গুণ, স্টিফেন ওয়াটস, মাসুদ খান, মারম্নফ রায়হান, কবি ওবায়েদ আকাশ।
সংহতির সাধারণ সম্পাদক সামসুল হক এহিয়ার স্বাগত বক্তব্য প্রদানের পর অতিথিরা কাব্যরসের রসালো পতাকা উড়িয়ে বক্তৃতা করেন। আর স্বরচিত কবিতা পাঠ শুরম্ন হলে মনেই হয়নি রস নেই, ছন্দ নেই, আনন্দ নেই। কবিতা পাঠে অংশ নেন কবি কাদের মাহমুদ, কবি শামীম আজাদ,কবি নূরম্নজ্জামান মনি, কবি শাহ শামীম আহমদ, কবি মুজিবুল হক মনি, কবি আবদুল কাইয়ূম, মাসুক ইবনে আনিস, শামসুল হক এহিয়া ও শামীম শাহান সহ প্রবীন ও নবীন কবিরা।
ড. আনোয়ারম্নল ইসলামের ও সমর সাহার আবৃত্তির পর বাংলাদেশের হাই কমিশনার ড. সাইদুর রহমান খান, নির্বাহী মেয়র লুতফুর রহমান ও সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক আবু তহের শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন।
দফায় দফায় শতাধিক কবির স্বরচিত কবিতা পাঠ, কবিতা আবৃত্তি, বৃন্দ আবৃত্তি, জারীগান, কাব্যনৃত্যের পর অনুষ্ঠিত হয় পদক দান অনুষ্ঠান। এবার অনাবাসী কবি ও অতিথি কবিদের মধ্যে সংহতি পদক পেয়েছেন কবি কুদরত উল ইসলাম (মরণোত্তর), আজীবন সম্মাননা কবি মাসুদ আহমেদ, কবিতায় কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু, বিশেষ অবদানের জন্যে কবি ও ছড়াকার দিলু নাসের, আজীবন সম্মাননা মাসুদ খান, গুণীজন সম্মাননা পদক কবি নির্মলেন্দু গুণ ও বিশেষ সম্মাননা পদক কবি ওবায়েদ আকাশ।