আমাদের শরীরের বিভিন্ন কোষে যে জিনগুলো রয়েছে তাদের সকলেই যদি একই সময়ে প্রকাশিত হতো, তাহলে কি হতো? কোষটি মারা যেত। "তত্ত্বীয়ভাবে" এরকম উত্তরই দেয়া হয়ে থাকে। শুধুমাত্র টিকে থাকার জন্য তাদের একই সময়ে প্রকাশিত হতে দেয়া যাবে না একথা বললে পুরো ব্যাপারটিকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত করে প্রকাশ করা হবে। অধ্যায়ের শুরুতেই যে প্রশ্নটি করা হয়েছে তার জবাবে 'তত্ত্বীয়ভাবে' শব্দটি ব্যবহার করার পেছনে কারণ রয়েছে। কেননা বাস্তবে সকল কোষে একই সময়ে সকল জিন এক সাথে প্রকাশিত হয় না। এমনকি সুনির্দিষ্ট একটি কোষেও যেকোন সময়ে সকল জিন প্রকাশিত হয় না। এখানেই আমাদের জীবন প্রক্রিয়ার মূল কিছু সত্য মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করার আছে। সবগুলো জিনের একই সাথে প্রকাশিত না হওয়ার পেছনে নানা রকম বৈচিত্র্যপূর্ণ কারণ রয়েছে। যেমন: জীবদেহে সকল কোষ একই সময়ে বিভাজিত হয় না। তাই জীবদেহে সকল কোষে একই সময়ে বিভাজনের সাথে জড়িত জিনগুলো সক্রিয় থাকার দরকার নেই। ভ্রূণ মানেই হচ্ছে বৈচিত্র্যপূর্ণ কোষসমষ্টি। এই বৈচিত্র্যপূর্ণ কোষসমূহ তৈরির জন্য এক এক কোষে এক এক ধরনের জিন সক্রিয় থাকতে হয়। জাইগোট থেকে সৃষ্ট বহুকোষী জীব হচ্ছে মানুষ। জাইগোটে মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মাধ্যমে সমসংখ্যক ক্রোমোজোমবিশিষ্ট নতুন কোষ সৃষ্টি হয়। এই নতুন কোষদ্বয়ে আবার বিভাজন হয় এবং এভাবে অবিরাম ভাবে চলতে থাকে নিয়ন্ত্রিত বিভাজন। এই নিয়ন্ত্রিত বিভাজনের এক পর্যায়ে এসে ভ্রূণ সৃষ্টি হয়। ভ্রূণ জীবের অত্যন্ত বিন্যস্ত একটি গঠন। এই বিন্যস্ত গঠনটি আমরা-গ্যাস্ট্রুলেশন(এধংঃৎঁষধঃরড়হ), বাস্টুলেশন (ইধংঃঁষধঃরড়হ), ক্লিভেজ (ঈষবধাধমব) এরকম বেশ কয়েকটি বিন্যাস প্রক্রিয়ার পরে পেয়ে থাকি। প্রতিটি জীবের নিজস্ব অনন্য ভ্রূণ বিন্যাস রয়েছে। একটি বহুকোষী জীবের ভ্রূণের সাথে অপর বহুকোষী জীবের ভ্রূণের বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান। বিকাশ জীব-বিজ্ঞানের (উবাবষড়ঢ়সবহঃ ইরড়ষড়মু) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই ভ্রূণ গঠন (ঊসনৎুড়মবহবংরং)। ভ্রূণ গঠন প্রক্রিয়াটি বেশ কিছুু সময় ধরে হয়ে থাকে এবং প্রক্রিয়াটিকে জিনের নিয়ন্ত্রিত প্রকাশভঙ্গি দিয়ে অত্যন্ত সহজে উপস্থাপন করা যায়। ভ্রূণের বৈচিত্র্যপূর্ণ কোষগুলো ভবিষ্যতে চোখ, নাক, ত্বক, হৃৎপি- ইত্যাদি নানারকম অঙ্গ তৈরি করে। অঙ্গগুলোতে কোষসমূহ বৈচিত্র্যপূর্ণ থাকায় আমরা চোখের কোষ আর ত্বকের কোষের মাঝে যথেষ্ট পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করে থাকি। এই পার্থক্যগুলো যদি না থাকতো অর্থাৎ সকল কোষ সকল সময় একই রকম থাকতো, তাহলে জাইগোট থেকে শেষমেষ একটি "পি-" পাওয়া যেত মাত্র। চোখের কোষ আর ত্বকের কোষের মধ্যে অথবা স্নায়ুকোষে আর ত্বকীয় কোষের মধ্যে যে পার্থক্যগুলো পরিলক্ষিত হয়, তার সাথে জিনের নিয়ন্ত্রিত প্রকাশ ব্যাপারটি সম্পর্কিত। যদিও তাদের সৃষ্টি আদিকোষ জাইগোট থেকে তারপরও তারা ভিন্ন অর্থাৎ উৎস একই হওয়া সত্ত্বেও কেন তারা বৈচিত্র্যপূর্ণ হচ্ছে? একথা ঠিক যে, জাইগোট থেকে মাইটোসিস বিভাজনের মাধ্যমে সৃষ্ট প্রতিটি কোষে একই জিন থাকে, তবুও কোষগুলো ভিন্ন ভিন্ন কাজ করে। এর কারণ হচ্ছে স্নায়ুকোষে এমন জিন সক্রিয় আছে যা ত্বকীয় কোষে নিষ্ক্রিয়। আবার ত্বকীয় কোষে এমন কিছুু জিন সক্রিয় আছে যেগুলো স্নায়ুকোষে নিষ্ক্রিয়। জিনের এই সক্রিয়তা-নিষ্ক্রিয়তা দ্বারা কোষগুলোর বৈচিত্র্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত হয়। তবে কিছু জিন রয়েছে যেগুলো কোষের টিকে থাকার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। এগুলো সকল কোষে সক্রিয় থাকে। এই জিনগুলোর নাম হচ্ছে- "গৃহরক্ষী জিন" ঐড়ঁংব শববঢ়রহম এবহব)। আর যে জিনগুলো বিশেষ বিশেষ কোষে থেকে বৈচিত্র্যপূর্ণ আর বিশেষিত কোষ সৃষ্টি করছে, তাদের ুখঁীধৎু এবহবচ্ বলে। একটি কোষে থাকা সক্রিয় জিনগুলোর সংখ্যা এবং ধরনকোষের প্রয়োজনীয়তার সাপেক্ষে নির্ধারিত হয়ে থাকে। কোষের যে পরিমাণ শক্তি ধারণ-ক্ষমতা রয়েছে, জিন সক্রিয়করণে তার চেয়ে অধিক শক্তির প্রয়োজন দেখা দিলে, কোষ অতিরিক্ত জিনকে সক্রিয় হতে দেয় না। ফলে বেশ কিছু জিন নিষ্ক্রিয় থাকে। তবে নিষ্ক্রিয় জিন নষ্ট হয়ে যায় না। দেখা যায় যে, এক বংশে থাকা নিষ্ক্রিয় জিন পরবর্তী যে কোন বংশে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে সক্রিয় হয়ে ওঠে। আমরা অতিক্ষুদ্রের জগতের বাইরে থেকে অত্যন্ত সাধারণ বলে বোধ হওয়া চারপাশে যদি তাকাই, তাহলে কি দেখতে পাবো? দেখবো সেখানে একটা সমাজ বর্তমান, রাষ্ট্র বর্তমান এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে বিভিন্ন মানুষ বর্তমান। একটা মানুষের সাথে অপর মানুষের মিল-অমিল এবং সম্পর্কের ধরন কিরূপ হবে তাও বর্তমান। আসলে আমাদের পূর্বপুরুষের চেতনায় এই বিষয়গুলো ধরা দিয়েছে। তারা সমস্যা অনুভব করেছে, পদক্ষেপ নিয়েছে, নিয়ম তৈরি করেছে। সেগুলো লালিত হচ্ছে বেঁচে থাকা বিভিন্ন মানুষের মধ্যে। কিছু নিয়ম কেউ ভাঙছে, তাও আবার পুরনো নিয়মের সাথে তুলনা করে।