সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ সাত বিচারপতি স্বাক্ষরিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ে গুরুত্বপূর্ণ ১৬টি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে_ আগামী দুই সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে, তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কর্মকর্তা নিয়ন্ত্রণ করবেন নির্বাচন কমিশন এবং ওয়ান-ইলেভেনের দুই বছরের অবৈধ শাসনকে ক্ষমা করা হলো। বিচারপতি খায়রুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে মূল যে কথাটি লিখেছেন তা হচ্ছে_ 'তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুধু জনগণের দ্বারা নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যগণ দ্বারা গঠিত হইতে হইবে।'
রায়ে বলা হয়েছে_ 'সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬, ২০১১ সালের ১০ই মে তারিখ হইতে ভাবীসাপেক্ষভাবে (প্রোসপেকটিভলি) অসাংবিধানিক তথা অবৈধ ঘোষণা করা হইল এবং আপীলটি খরচা ব্যতিরেকে মঞ্জুর করা হইল।'
রায়ের ১৬ দফা সারাংশে বলা হয়েছে_ (১) জনগণ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মালিক, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস, জনগণই একমাত্র সার্বভৌম; (২) বাংলাদেশের সরকার মানুষের সরকার নহে, আইনের সরকার; (৩) সংবিধান বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন, ইহা বাংলাদেশের সকল প্রতিষ্ঠান ও পদ সৃষ্টি করিয়াছে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও দায়িত্ব অর্পণ করিয়াছে; (৪) জনগণের সার্বভৌমত্ব, প্রজাতন্ত্র, গণতন্ত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামো; (৫) গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কোন ধরনের ছেদ বাংলাদেশের সংবিধান অনুমোদন করে না; (৬) সুপ্রীম কোর্ট ইহার জুডিশিয়াল রিভিউ এর ক্ষমতাবলে যে কোন অসাংবিধানিক আইনকে অবৈধ ঘোষণা করিতে পারে বা বাতিল করিতে পারে; (৭) কোন মোকদ্দমার শুনানিকালে কোন আইনের সাংবিধানিকতার প্রশ্ন উত্থাপিত হইলে সুপ্রীম কোর্ট সে সম্পর্কে নির্লিপ্ত থাকিতে পারে না, আইনের প্রশ্নটি নিরসন করাই সুপ্রীম কোর্টের দায়িত্ব; (৮) সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে জাতীয় সংসদ সংবিধানের যে কোন সংশোধন করিতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কিন্তু রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি ও সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ক্ষুণ্ন বা খর্ব বা সংশোধন করিতে পারে না; (৯) সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬, বাংলাদেশ সংবিধান সংশোধন করিয়াছে; (১০) সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬, রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে খর্ব করিয়াছে বিধায় উক্ত তর্কিত আইন অসাংবিধানিক ও অবৈধ, সুতরাং বাতিল হইবে; (১১) বিশেষ প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ও কারণাধীনে কোন আইন ভাবীসাপেক্ষভাবে (প্রোসপেকটিভলি) অবৈধ ঘোষণা বা বাতিল করা যাইতে পারে; (১২) সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবার ক্ষেত্রে, জাতীয় সংসদের বিবেচনা অনুসারে, যুক্তিসঙ্গত সময় পূর্বে, যথা, ৪২ (বিয়ালি্লশ) দিন পূর্বে, সংসদ ভাঙ্গিয়া দেওয়া বাঞ্ছনীয় হইবে, তবে, নির্বাচন পরবর্তী নূতন মন্ত্রিসভা কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত পূর্ববর্তী মন্ত্রিসভা সংক্ষিপ্ত আকার গ্রহণ করতঃ উক্ত সময়ের জন্য রাষ্ট্রের স্বাভাবিক ও সাধারণ কার্যক্রম পরিচালনা করিবেন; (১৩) সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬, অসাংবিধানিক ও অবৈধ হইলেও জাতীয় সংসদ ইহার বিবেচনা ও সিদ্ধান্ত অনুসারে উপরে বর্ণিত নির্দেশাবলী সাপেক্ষে দশম ও একাদশ সাধারণ নির্বাচনকালীন সময়ে প্রয়োজনমত নূতনভাবে ও আঙ্গিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে; (১৪) সাধারণ নির্বাচনের তপসীল ঘোষণার তারিখ হইতে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার তারিখ পর্যন্ত নির্বাচনের সহিত প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং নির্বাচন কমিশনের বিবেচনা অনুসারে এমনকি পরোক্ষভাবে জড়িত, রাষ্ট্রের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকিবে; (১৫) বিদ্যমান সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদের শর্ত এর পরিবর্তে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ৫৬(৪) অনুচ্ছেদ গণতন্ত্রের স্বার্থে আনয়ন করা প্রয়োজন; (১৬) ২০০৭ সালে দ্বিতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ৯০ দিন মেয়াদ পরবর্তী অতিরিক্ত প্রায় দুই বছর সময়কাল প্রশ্নবিদ্ধ বিধায় ঐ অতিরিক্ত সময়কালের কার্যাবলী মার্জনা করা হইল।