গড় রেটিং: 2.6/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)
|
|
|
|
|
Update : 2012-09-04 11:06:46
|
আমার দেখা আলতা বানু
আকতার হোসেন
খুব কম মানুষ থাকে যাদের জীবনে একাধিক উত্তরণ ঘটে। নিশীথ প্রাশান্তি নির্ঝুম যেন সেই সমস্ত মানুষের দলে ভিড়ে যাচ্ছে। নাম নিশীথ কিন্তু তাঁর আঙিনায় এখন সকালের মিষ্টি রোদ। ইতিমধ্যে সে নাচ, গান ও অভিনয়ের ভুবনে দীপ্তি ছড়াতে শুরু করেছে। সম্প্রতি সে জাঁকজমক পূর্ন প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিস ওয়ার্ল্ড কানাডায় অংশ নিয়ে মিস ফটোজনিক অব মিস ওয়ার্ল্ড কানাডা ২০১২ সহ টপ থ্রি হবার গৌরব অর্জন করেছে। এ ছাড়া সে বিভিন্ন স্থানে স্বেচ্ছাকর্মীর কাজও করে যাচ্ছে। একই সাথে চলছে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া।
এত অল্পবয়সে এতগুলো কাজ একত্রে শুরু করা নবীনদের পক্ষেই সম্ভব। তাই নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, নির্ঝুম হয়তো ক্লান্ত না হয়ে ঠিক সময়ে পৌঁছে যাবে সাফল্যের জগতে! মা-বাবার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নির্ঝুম নৃত্য ও সঙ্গীত জীবন শুরু করেছিল কিন্তু হটাৎ করে আমি আরো একটি বোঝা তুলে দিয়েছিলাম ওর কাঁধে। সেটা ছিল অভিনয়। সেই অভিনয় নিয়ে কিছু কথা বলবো। আগামি ১৫ সেপ্টেম্বর টরন্টোর চায়নিজ কালচারাল সেন্টারের নির্ঝুমের একক নৃত্যমালা যারা দেখতে যাবেন তারা হয়তো একটি অনন্য সুন্দর নৃত্য অনুষ্ঠান দেখে চলে আসবেন। এই কথাগুলো জানা থাকলে নির্ঝুমের গুনাগুন বিচারে ভিন্ন মাত্রা পাবে বলে আশা করছি।
নতুন নাটক ‘আলতা বানু’র নাম ভূমিকার অভিনেত্রীর খোঁজে আমাকে এখানে-সেখানে চোখ তুলে তাকাতে হতো। একদিন চোখ গেল বুলগেরিয়ান চার্চের মঞ্চের দিকে। একটি মেয়ে নূপুর পায়ে নেচে যাচ্ছে তালে তালে। তাঁর চোখমুখে যে চঞ্চলতা আর দৃষ্টিকাড়া হাসি সেই-তো আমারই আলতা বানু! অনুষ্ঠান সূচি খুলে দেখলাম মনকাড়া একটি নাম। নির্ঝুম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম সুযোগ বুঝে নির্ঝুমের সাথে যোগাযোগ করবো। যদি সম্ভব হয়, ওকে দিয়েই আলতা বানুর কাজটি করাবো। তবে ভুল করে সেদিন ওর সাথে কথা না বলে চলে এসেছিলাম। ভাগ্য প্রসন্ন ছিল তাই অল্প কিছুদিনের মধ্যে সেই বুলগেরিয়ান চার্চের আরেক অনুষ্ঠানে নির্ঝুমের নাচ দেখতে গেলাম। গোলাপি শাড়ি পরে ও সেদিন নাচলো ‘আমার কাঙ্খের কলসি গিয়াছে ভাসি’ গানটির সাথে। কি আশ্চর্য, ঠিক সেই গ্রাম্য সরলতা, সেই লাফিয়ে চলা, সেই হেলেদুলে মঞ্চ আগলে রাখা এক রাজকন্যা! আর ভুল নয়। ফিরে আসার আগে সিঁড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। উদ্দেশ্য ওর কন্ঠ শুনবো। পাশ দিয়ে যাবার সময় বললাম, তোমার নাচ ভাল হয়েছে ঠিক বরাবরের মতো। ও অবাক হল, অচেনা এক মুখ থেকে প্রশংসা হয়তো আশা করেনি! তবুও বললো - থ্যাঙ্ক ইউ আঙ্কেল! হয়ে গেল কাজ। মেয়েটা বোবা নয় সেটা যেমন জানা গেল, সাথে সাথে তার অবাক হবার ভঙ্গিটাও দেখা হয়ে গেল। এরপর থেকে শুরু হল খোঁজ-খবর। অমনিবাস ট্যাক্স এন্ড এ্যাকাউন্টিং সার্ভিসের কর্নধার মোস্তাক ভাই আমার পক্ষ হয়ে নির্ঝুমের মায়ের সাথে যোগাযোগ করলেন। কিন্তু আপত্তি এল এই বলে যে, নির্ঝুম কখনো অভিনয় করেনি কাজেই সে কি মঞ্চে অভিনয় করতে পারবে! তা-ও আন্তর্জাতিক বাংলা নাট্য প্রতিযোগিতায় কোলকাতার বিচারকদের সামনে? আমি বললাম, ওকে অভিনয় করতে হবে না। ও শুধু আমার আলতা বানু হবে। আর তাঁকে তৈরি করে নেবার দায়িত্ব আমার। তারপর শুরু হল কাজ। নির্ঝুমের সাথে মঞ্চে অংশ নিতে রাজি হলেন মঞ্চনাটকের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব আহমেদ হোসেন। সৌভাগ্যবশত তিনি কয়েক বছর আগে টরন্টোর স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছিলেন। চললো নাটকের প্রস্তুতি। আলতা বানু’র দলে যোগ দিলেন আরো তিনজন গুণী ব্যক্তি। কাজি হেলাল, কনক এবং টরি। প্রায় চার মাস চললো রিহার্সাল। যা চেয়েছিলাম তার থেকে অনেক বেশি সহযোগিতা দিল নির্ঝুম। খুব বেশিদিন লাগেনি ওর চরিত্রের সাথে মিশে যেতে। ভীষণ বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আমার সব নির্দেশনা শুনে যেতে লাগল। ভাবতে লাগলাম, নির্ঝুম নাচ-গান না শিখে সেই ছোট বেলা থেকে শুধু অভিনয় করল না কেন! অভিনয়তো ওর ভেতর নোঙ্গর করে আছে! আমি এখনো অবাক হই এই ভেবে যে, নাট্য প্রতিযোগিতায় নির্ঝুম কেন পুরস্কার পেল না। আমাকে দেয়া হয়েছিল শ্রেষ্ঠ ইনোভেটিভ স্ক্রিপটের পুরস্কার- সেটা হাতে নিয়ে আমি মুখ নিচু করে বসে আছি আর ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেয়ে যাচ্ছি। এতোটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে চার মাস আমাকে যেভাবে একনিষ্ঠ অভিনয় দেখিয়ে অভিভূত করে গেল, তাঁর কোন কিছু কেন বিচারকরা দেখতে পেল না। আবার ভাল লাগলো এই দেখে যে, অতোটুকু মেয়ে ঠিকই বুঝে নিয়েছিল যে সে যতোটুকু অভিনয় করেছে ততোটুকুতে তার নিজস্ব তৃপ্তি রয়েছে।
টরন্টোবাসীকে নির্ঝুমের অভিনয়ের দক্ষতার সাথে সাক্ষাত ঘটিয়ে দেবার জন্য প্রতিযোগিতার বাইরে শুধু ওর কথা চিন্তা করে আরো একটি নাটক লিখেছিলাম। ‘চার দেয়ালের জীবন’ নামের সেই নাটকে হুইল চেয়ারে বসে বসে শারীরিক এক প্রতিবন্ধীর যে অভিনয় নির্ঝুম করেছিল এখনো ইউটিউবে তাঁর সেই অভিনয় দেখে আমার চোখ থেকে পানি নেমে আসে।
শুনেছি পাখিরাও নাকি প্রথম প্রথম ডানা ঝাপটিয়ে উড়তে গিয়ে ব্যর্থ হয়, কিন্তু নির্ঝুম মঞ্চে উড়েছিল প্রথম দিনের অভিনয় দিয়ে। এ সত্য আমি নিজ চোখে দেখেছি। ওর সাথে কাজ করতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি।
‘দুই পায়ে আলতা মাইখ্যা
সে পায়ে নূপুর বাইন্ধ্যা
দুই হাতে উঁচা কইরা শাড়িটা।
শ্লোক বলা খেলতে আইস্যা
বন্ধক দিলাম হূদয়টা।...
শ্লোক বলা আপাতত শেষ।
মায়ে যদি জাইগা উঠে অমাবস্যার রাইতে
এখন বাড়ি যাই আসবো আবার পরে।
ক্ষীরগুলা খাইয়া নিও
নিজ হাতে বানাইছি- রসের ক্ষীর।
হাত পুড়ছে রানতে গিয়ে
জিব পুড়ছে মিষ্টি চাখতে গিয়া
তুমি না খাইলে -পরাণ যাইব পুইড়া’।
- আলতা বানু