গড় রেটিং: 3.0/5 (3 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)
|
|
|
|
|
Update : 2012-06-25 11:39:10
|
অশ্লীলতার আগ্রাসন সৃষ্টি এবং বন্ধে এফডিসি’র ভূমিকা
চলচ্চিত্র নির্মাণে একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন, যা সবার কাছে ‘এফডিসি’ নামে পরিচিত। সিনেমাপ্রেমী সাধারণ মানুষের কাছে এফডিসি মানেই স্বপ্নের একটি জগৎ। তাদের ধারণা, এই জগতে যারা কাজ করেন, বিশেষ করে নায়ক-নায়িকা, তারা ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা। নায়ক-নায়িকারা প্রতিদিন ভাত খান কিনা, ঘুমান কিনা, কিভাবে দিন কাটান এসব নিয়ে তাদের কৌতূহলের কোন শেষ নেই। তাই তো এফডিসি প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত অনেক সিনেমাপ্রেমী মানুষ গভীর আগ্রহ আর কৌতূহল নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন এফডিসি’র গেটে তাদের প্রিয় তারকাকে একনজর দেখার জন্য। কোন গাড়ি প্রবেশ করতে কিংবা বের হতে দেখলেই ছুটে যান কাছে। প্রাণপণ চেষ্টা করেন গাড়ির ভেতরে থাকা মানুষটিকে দেখার জন্য। এ কারণে মাঝে-মধ্যে এফডিসি’র নিরাপত্তা কর্মীদের তাড়া খেতে হয় তাদের। তারপরও আগ্রহে কমতি নেই তাদের। কিন্তু এই স্বপ্নের এফডিসি’র অভ্যন্তরে এখন কি ঘটছে, কিভাবে চলছে স্বপ্নের এ প্রতিষ্ঠান তা দর্শকদের অজানা থাকলেও স্বপ্নের এফডিসিকে নিয়ে আজ চলচ্চিত্র শিল্পী-কলাকুশলীদের স্বপ্ন ভঙ্গ হওয়ার পথে। নানা সমস্যা আর সরকারি অবহেলার শিকার চলচ্চিত্র নির্মাণের একমাত্র এ প্রতিষ্ঠানটি। চলচ্চিত্র নির্মাণে এফডিসি’র নানা সমস্যা, বিভিন্ন সঙ্কট আর এই সঙ্কট উত্তরণের পথ খোঁজা হয়েছে এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনে। ৮ পর্বের এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনটি লিখেছেন মোহাম্মদ আওলাদ হোসেন
চলচ্চিত্রের অশ্লীলতার আগ্রাসন সৃষ্টির নেপথ্যে যেমন এফডিসি’র ভূমিকা ছিল তেমনি এক সময় অশ্লীলতা বন্ধেও এই এফডিসিই কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। পার্থক্য ছিল একটাই, সেটা হচ্ছে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবে কিছু লোক অশ্লীল ছবি নির্মাণ ও প্রদর্শন করেছে। ওই সময় এফডিসি কর্তৃপক্ষ তাদের সমর্থন জুগিয়েছে। ২০০১ সালে বিএনপি’র নেতৃত্বে জোট সরকার যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে তখন এফডিসি’র এমডি’র দায়িত্ব দেয়া হয় বিশিষ্ট অভিনেতা এবং জাসাস সভাপতি ওয়াসিমুল বারী রাজীবকে। রাজীব এমডি’র দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি চলচ্চিত্রকে সচল করার জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করেন। চলচ্চিত্র শিল্পের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, চলচ্চিত্র সম্পর্কে ধ্যান, জ্ঞান রয়েছে এমন একজন ব্যক্তিকে এফডিসি’র এমডি’র দায়িত্ব দেয়া হোক। বিএনপি সরকার চলচ্চিত্রের এই দাবি মেনে রাজীবকে এমডি’র দায়িত্ব প্রদান করে। রাজীব এমডি’র দায়িত্ব নেয়ার পর চলচ্চিত্র নির্মাণ বৃদ্ধির জন্য মাত্র এক লাখ দশ হাজার টাকার বিনিময়ে প্রযোজকদের ছবি নির্মাণের সুযোগ করে দেন। এ সুযোগে প্রযোজকদের পাশাপাশি তাদের পিয়ন-চেকাররাও কম বাজেটে কথিত বাণিজ্যিক ছবির নামে অশ্লীল ছবি নির্মাণ শুরু করে। রাজীবের পৃষ্ঠপোষকতায় চলচ্চিত্রের ১০ জন প্রভাবশালী প্রযোজক একজোট হয়ে ‘দশ ভাই’ নামে আত্মপ্রকাশ করেন এফডিসি’র অভ্যন্তরে গরু জবাই করে ভূরিভোজের মাধ্যমে। কয়েক হাজার লোককে আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে শুরু করেন দশটি কথিত লো-বাজেটের কমার্শিয়াল ছবির নামে অশ্লীল ছবি নির্মাণের মহোৎসব। জোট সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীকে দিয়ে প্রথম ছবির মহরতও করা হয়। শুরু হয় অশ্লীল ছবি নির্মাণের মাধ্যমে চলচ্চিত্র শিল্প ধ্বংসের পাঁয়তারা। ওই সময়ে অধিকাংশ প্রযোজক মেতে ওঠেন এই অশ্লীল খেলায়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় কতিপয় অসাধু প্রেক্ষাগৃহের মালিক, তাদের প্রতিনিধি বুকিং এজেন্ট, সেন্সর বোর্ডের কতিপয় সদস্য এবং অনেক শিল্পী নামধারী দেহজীবী। ওই সময় একটি অশ্লীল ছবি সেন্সর ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য একজন প্রযোজককে প্রায় এক লাখ টাকা প্রস্তুত রাখতে হতো। ছবিতে দুই ধরনের গান চিত্রায়িত হতো। সেন্সরে জমা দেয়া হতো সাদামাটা গান। ছাড়পত্র পাওয়ার পর সেই গান বাদ দিয়ে যোগ দেয়া হতো ভয়াবহ অশ্লীল গান। আর এই দৃশ্যগুলো প্রিন্ট করার জন্য এফডিসি’র ল্যাবের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেয়া হতো মোটা অংকের টাকা। অনেক প্রযোজক অধিক নিরাপত্তার জন্য বেসরকারি ‘বারি স্টুডিও’কে ব্যবহার করতে শুরু করেন। ভয়ঙ্কর অশ্লীল দৃশ্যসমূহের ডাবিং এডিটিং এবং প্রিন্ট হতো ‘বারি স্টুডিও’তে। সেন্সর বোর্ডে রাজনৈতিক পরিচয়ে স্থান পাওয়া সদস্যরা দুই হাতে অর্থ কামাই করতে থাকেন। কতিপয় সদস্য নায়িকাদের সঙ্গে প্রেম-ভালবাসাতেও জড়িয়ে পড়েন। কখনও রাজনৈতিক কারণে বিরোধী দল করেন এমন কোন প্রযোজকের ছবি সেন্সর বোর্ড অশ্লীলতার অভিযোগে ছাড়পত্র দিতে আপত্তি জানালে ওই প্রযোজক আদালতের শরণাপণ্ন্ন হয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করে সেন্সর বোর্ডের নিষেধাজ্ঞার ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন এবং সম্পূর্ণ অশ্লীল দৃশ্য সংযোজন করে প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেরা অর্থ কামাই করেন। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহ থেকে মধ্যবিত্ত দর্শক বিশেষ করে মহিলা দর্শকদের বিতাড়িত করে দেন। চলচ্চিত্রের কিছু মানুষ এর প্রতিবাদ করলেও অশ্লীল ছবির নির্মাতারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কারণে তারা কিছুই করতে পারেননি। এফডিসি’র মধ্যেই শুটিং হয় অশ্লীল ছবির। অনেক প্রযোজক অধিক নিরাপত্তার জন্য চলে যান দিনাজপুরের স্বপ্নপুরীতে। সেখানে এক ছবির শুটিং করতে গিয়ে অশ্লীলতার ভয়াবহতা দেখে পালিয়ে এসেছিলেন হুমায়ুন ফরীদি ও দিলদারের মতো অভিনেতা। মৌসুমী, ফেরদৌস, রিয়াজ, পূর্ণিমারা চলে যান আড়ালে। কিন্তু অশ্লীল ছবির বিরুদ্ধে একাই যুদ্ধ চালিয়ে যান মান্না। অশ্লীলতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে তৎকালীন তথ্য সচিব তাসাদ্দেক বেগের সামনেই তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিল অশ্লীল ছবির ধারক-বাহক ও পৃষ্ঠপোষকরা। কিন্তু মান্না দমে যাননি। প্রতিবাদ চালিয়ে যান। এক সময় রাজীবের মৃত্যু হলো। এফডিসি’র এমডি’র দায়িত্বে যিনি আসেন তিনিও অশ্লীলতার বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারেননি। এরপর ঘটে রাজনৈতিক পরিবর্তন। আসে ওয়ান-ইলেভেন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তখন এফডিসি’র এমডি’র দায়িত্বে আসেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আ ন ম বদরুল আমিন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রথমেই অশ্লীলতা বন্ধে উদ্যোগ নেন। সহযোগিতা চান এলিট ফোর্স র্যাবের। র্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল গুলজার (বিডিয়ার বিদ্রোহে নিহত) র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক কর্নেল হামিদের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে দেন। এ টাস্কফোর্স মাত্র এক মাসের মধ্যে চলচ্চিত্রের অশ্লীলতা বন্ধ করে দেয়। অশ্লীল ছবির নির্মাতা, শিল্পী, ধারক-বাহক, প্রদর্শক এবং পৃষ্ঠপোষকরা পালিয়ে যায়। কতিপয় প্রভাবশালী নেতা এবং প্রযোজকরাও থাকেন দৌড়ের মধ্যে। ফিল্মপাড়া খ্যাত কাকরাইল ও গুলিস্তানে অভিযান চালিয়ে আটক করা হয় অসংখ্য অশ্লীল ছবিসহ অনেককেই। অশ্লীল ছবির ধারক-বাহকেরা যে যেভাবে পেরেছেন সবকিছু ফেলে পালিয়ে গেছেন। এফডিসি’র তৎকালীন এমডি আ ন ম বদরুল আমিন, কর্নেল গুলজার এবং মেজর হামিদসহ টাস্কফোর্সের সদস্যরা চলচ্চিত্র থেকে অশ্লীলতার আগ্রাসন বন্ধ করে ইতিহাস হয়ে যান। তাদের অভিযানকে সমর্থন জানিয়ে দর্শকরাও অশ্লীল ছবির চিহ্নিত শিল্পী-পরিচালকদের প্রত্যাখ্যান করেন। এফডিসি ও চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি অনেক শিল্পীকে কালো তালিকাভুক্ত করে। বন্ধ হয়ে যায় অশ্লীলতা সেই সঙ্গে বারি স্টুডিও। চলচ্চিত্রে ফিরে আসে সুস্থধারা। কিন্তু পরে বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার অশ্লীলতার আগ্রাসন শুরু হলেও দর্শক প্রত্যাখ্যান করার কারণে সুবিধা করতে পারেনি। বর্তমানে অশ্লীল ছবি নির্মিত না হলেও পুরনো ছবিগুলোয় অশ্লীল দৃশ্য সংযোজন করে দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হচ্ছে। কিন্তু দর্শক এসব আর দেখছেন না। এমনকি এক সময়ের গরম নায়িকা ময়ূরী, পলিরা সুস্থধারার ছবির মাধ্যমে ফিরে আসার চেষ্টা করলেও দর্শক তাদের গ্রহণ করেননি। চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার আগ্রাসন যখন জোরালো তখন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সদস্য ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রতারকা ববিতা। চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার আগ্রাসন প্রসঙ্গে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, অশ্লীলতাই আমাদের চলচ্চিত্র জগৎকে পুরোপুরি পিছিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, আমি তখন সেন্সর বোর্ডের সদস্য। তখন শুধু শুনতাম, ‘কাটপিস’ বলে একটি কথা। দেখতাম সিলগালা করে কিছু ফিল্ম রাখা হয়েছে যেগুলো র্যাব আটক করেছে। ভাবতাম, হয়তো বেশি খোলামেলা পোশাক পরা নাচগান হবে। কিন্তু একদিন ‘কাটপিস’ দেখতে গিয়ে তো ভায়াবহ অবস্থা। আমরা যারা মহিলা সদস্য ছিলাম তারা লজ্জায় রুম থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম। অবিশ্বাস্য সেই সব দৃশ্য। ববিতা বলেন, কিছু প্রযোজক নামধারী অসাধু লোক অশ্লীল ছবি নির্মাণ করে নিজেরা পয়সা কামিয়েছে। পাশাপাশি চলচ্চিত্র শিল্পকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এর সঙ্গে অনেক সিনেমা হল মালিকও জড়িত ছিল। ববিতা বলেন, পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা বন্ধ হলেও মহিলা দর্শকরা আর প্রেক্ষাগৃহে ফিরে যাননি। যার কারণেই চলচ্চিত্রের আজ এই দুরবস্থা। এসব দেখে দুঃখ লাগে। তিনি বলেন, মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আমরা চলচ্চিত্রের সোনালী যুগের শিল্পী ছিলাম। আমাদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা দেখতে আসতো। এখন ছবি দেখার দর্শকও নেই। অশ্লীলতার আগ্রাসন বন্ধ হলেও মানহীন, গল্পহীন, বৈচিত্র্যহীন চলচ্চিত্র, শিল্পী সঙ্কট, প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ, দর্শকদের নিরাপত্তা, সব মিলিয়েই চলচ্চিত্রকে লম্বা একটা দুঃসময় পার করতে হচ্ছে। শিল্পের একজন মানুষ হিসেবে আমার কাছেও বেশ কষ্টকর বলে মনে হয়।