গড় রেটিং: 3.3/5 (3 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)
|
|
|
|
|
Update : 2012-05-06 11:39:13
|
আইন-আবেগের সন্ধিতে ফাহিমের নিয়তি
চয়ন খায়রুল হাবিব
আশ্রয়শিবির থেকে প্যারিসের শহরতলীর দাবা ক্লাব হয়ে ১১ বছরের ফাহিম আলম এখন ফ্রান্সের জাতীয় কিশোর দাবার চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু নাগরিকত্ব দূরে থাক ফ্রান্সে বসবাসের কাগজপত্রও নেই এক বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীর এ সন্তানের। এখন নাগরিকত্ব না বহিস্কার ফাহিমের ভাগ্যে কী জুটবে তা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন খোদ ফরাসি প্রধানমন্ত্রীও।
পাসপোর্ট নেই, আশ্রয়শিবিরেও নেই আশ্রয়
২০০৮ সালে ৭ বছরের ফাহিমকে নিয়ে বাবা নুর আলম প্যারিসে আসেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে একটা আশ্রয়শিবিরে ঠাঁই মেলে ফাহিম আর তার বাবার। ফরাসী আইন অনুযায়ী সরকারি মাসোহারা নিয়ে আর টুকটাক কাজকর্ম করে দিন কাটতে থাকে নূর আলম আর ফাহিমের। অপেক্ষা চলতে থাকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ তকমা দূর করে ফ্রান্সে বসবাসের বৈধ কাগজপত্রের। এভাবেই ফাহিমের ফরাসী অভিযাত্রার কথা তুলে ধরেছে ফ্রান্সের ‘ইনরকস’ পত্রিকা।
ফাহিমের বিস্ময়কর অর্জনের পর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে পত্রিকাটি জানায়, ফরাসী সরকার আর বাংলাদেশের কূটনীতিকদের মধ্যে চিঠি চালাচালি আর অভিবাসন আদালতের শুনানি শেষে ২০১০ সালে নূর আলমের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন ‘চূড়ান্তভাবে’ প্রত্যাখ্যাত হয়। বাবা-ছেলে আশ্রয় হারায় আশ্রয়শিবিরেও।
২০১১ সালের গ্রীষ্মে বাবা, ছেলে আক্ষরিক অর্থেই রাস্তায় নেমে আসে! রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে তাদের। এ সময় বারবার ঠিকানা বদলেছে তারা।
তাঁবুর জীবনেও ছিল দাবার প্রশিক্ষণ
দাবায় ফাহিমের মেধার কথা কখনোও ভুলে যাননি দাবা অনুরাগী নূর আলম। পলাতক জীবনে থেকেও ছেলের দাবা প্রশিক্ষণ চালিয়ে যান তিনি। একবার এক টূর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পেয়ে ‘অনূর্ধ্ব বিশ বছর’ বয়সী বিভাগে এবং জয়ী হয় ফাহিম। এ টুর্নামেন্টেই ফাহিম মনযোগ কেড়ে নেয় এক স্থানীয় দাবা প্রশিক্ষকের। সেই প্রশিক্ষক ফাহিমের বাবাকে ছেলেসহ প্যারিসের ক্রিটেই এলাকার দাবা ক্লাব ‘টমাস দু বুর্গেনেফে’ গিয়ে, জাতীয় প্রশিক্ষক জাভিয়ার পার্মনটিয়ে’র সাথে দেখা করার পরামর্শ দেয়।
ফাহিমের দাবা চর্চার কথা ভেবেই ক্রিটেই-তে চলে আসেন নূর আলম ও ফাহিম। ‘টমাস দু বুর্গেনেফে’-তে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও হয়ে যায়। কিন্তু চূড়ান্ত আর্থিক টানাপোড়েনে থেকেও দাবা প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে ক্রিটেই ছেড়ে যায়নি ওরা। উপয়ান্তর না পেয়ে শেষমেশ দাবা ক্লাব সংলগ্ন খালপাড়েই তাঁবু গেড়ে বসবাস শুরু করে নুর আলম আর ফাহিম। পরে বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং দাবা ফেডারেশনের সহানুভুতিশীল সদস্যদের বদান্যতায় বিভিন্ন পরিবারের সঙ্গে রাতে থাকবার ব্যবস্থা হয় ফাহিমের। আর নূর আলম কোনোমতে চালিয়ে যান তার ফেরারি জীবন।
এই সাবেক জাতীয় প্রশিক্ষক পার্মন্টিয়ে ততদিনে অবসর নিলেও মেধাবি কিশোর দাবাড়ুদের সাথে এই ক্লাবেই বিশেষ ওয়ার্কশপ পরিচালনা করে আসছিলেন। পার্মনটিয়ের মুখেই শোনা যাক ফাহিমের সাথে তার প্রথম সাক্ষাতকারের কথা।
“বাবার হাত ধরে একটা বাচ্চা ছেলেকে আসতে দেখতে পাই। ও তখন ফরাসি বলতে পারতো না। দাবার বোর্ডে আমি ওকে একটা সমস্যা দেই। অন্যান্য বাচ্চাদের তুলনায় অনেক কম সময়েই ফাহিম সমস্যাটার সমাধান করে ফেলে!”
পার্মন্টিয়ের প্রশিক্ষণে তার যোগ্য শিষ্য হিসাবে ফাহিম এ সময় কিশোর দাবায় বেশ কয়েকটি শিরোপা জিতে আনে। ফলে বেশ কিছুটা সাংগঠনিক আনূকূল্য জুটে যায় ফাহিম আর নূর আলমের জীবনে। বাকীটা এক বিস্ময় বালকের ফ্রান্স জয়ের ইতিহাস!
দাবার চাল আর রাজনীতির চাল!
২১ এপ্রিল ২০১২ ফ্রান্সের জাতীয় কিশোর দাবা প্রতিযোগিতার শিরোপা জয়ের খবরটি ফ্রান্সের গণমাধ্যমে আসে এক দারুণ চমক নিয়ে। বাংলাদেশের এক অবৈধ অভিবাসীর সন্তান কিশোর ফাহিম আলমের এ শিরোপা জয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়ে যায় চারদিকে। দাবার গুটি চেলে এ বিস্ময় বালকের শিরোপা জয় নিয়ে যেমন উৎসাহের অন্ত নেই সাধারণ মানুষের তেমনি তার ‘অবৈধ অভিবাসী’ পরিচয় নিয়ে চাল শুরু হয়ে গেছে ফরাসী রাজনীতিতেও।
ফ্রান্সে এখন চলছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এ সপ্তাহেই নির্ধারিত হচ্ছে আগামী পাঁচ বছর সমাজতন্ত্রী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রাসোয়া হল্যান্ড না কি দক্ষিণপন্থী বর্তমান রাষ্ট্রপতি নিকোলা সার্কোজির হাতে পরিচালিত হবে ফ্রান্স। আর ফরাসী রাজনীতিতে অভিবাসন এখন একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু হওয়ায় বিষয়টি বহুদূর গড়াতে পারে। নির্বাচনী বিতর্কে এক সরাসরি স¤প্রচারিত টক শো-তে ইতোমধ্যেই ফাহিমকে নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন দক্ষিণপন্থী প্রধানমন্ত্রী ফ্রাসোয়া ফিও।
পশ্চিমের অন্যান্য দেশের মত ফ্রান্সেও সামাজিক, রাজনৈতিক বিভিন্ন পর্যায়ে অভিবাসন, অবৈধ অভিবাসন একটা প্রবল বিতর্কিত ইস্যু! স্থানীয় জনগণকে উসকে দিতে, আইনশৃঙ্খলার অবনতির দোহাই পাড়তে, যত দোষ, তার পুরোটাই অভিবাসী নন্দ ঘোষদের উপর চাপাতে দক্ষিণপন্থীদের সবসময়ই ধরাবাঁধা বুলি আছে যা উপচে পড়ে নির্বাচনের মৌসুমে!
তো তক্কে, তক্কে থাকা এক শ্রোতা ফোন করে প্রশ্ন করলো যে দক্ষিণপন্থীরা অভিবাসীদের নিয়ে এতোরকম নেতিবাচক কথা বলে, তাদের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে আগত অবৈধ অভিবাসী কিশোর ফাহিমের জাতীয় কিশোর দাবার শিরোপা জয় সম্পর্কে জানেন কি না? প্রশ্নকর্তা আরো যোগ করে যে ফাহিমের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কী পদক্ষেপ নেবে?
প্রধানমন্ত্রী ফিও ফাহিমের অর্জন সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন যে, “ও (ফাহিম) যদি দাবাতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে থাকে, তাহলে ওর পরিস্থিতি আমাদের সর্বোচ্চ মনযোগের দাবিদার এবং তার জন্য আমরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফলের অপেক্ষা করবো না, আজকেই এর নিস্পত্তি করা হবে।”
অবশ্য ফাহিম আর নূর আলমকে বসবাসের অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে ফরাসী সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের কথা এখনও জানা যায়নি।
ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ না বহিস্কার?
ফাহিমের প্রশিক্ষক পার্মনটিয়ে এবং দাবা ফেডারেশানের কর্মকর্তারা সরকারের সাথে জোরালো দেন দরবার চালাচ্ছে ফাহিমকে তার বাবাসহ ফ্রান্সে বসবাসের বৈধ অনুমতি দিতে।
ফরাসী ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ও ফাহিম ও নুর আলমকে বৈধ করে নিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের বাইরে বিশেষ বিবেচনায় নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা চিন্তা করছে! ফ্রান্সের জাতীয় দাবা ফেডারেশানের উপ পরিচালক বলেছেন, জাতীয় কিশোর দাবায় চ্যাম্পিয়ান হয়ে ফাহিম আপনাআপনিই জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু কাগজপত্র না থাকায় ওকে জাতীয় দলে এক্ষনি ডাকা যাচ্ছে না।
কিন্তু ফাহিমকে ফরাসি দাবা ফেডারেশানের সুচক বা কোড দেবার আনুষ্ঠানিকতাগুলা নিয়ে এর মধ্যেই কাজ শুরু হয়েছে। উপপরিচালক জোডি লোপেজ আরো বলেন যে, আগামী অগাস্টে প্রাগে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ওরা ফাহিমকে নিয়ে যেতে চায়!
ফাহিমের সামনে এখন নাগরিকত্ব নিয়ে প্রাগে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ফ্রান্সের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ। নিয়তি কী ফাহিমকে ফ্রান্সের সীমানা পেরিয়ে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে নিয়ে যাবে না ‘অবৈধ বসবাসে’র দায়ে বাবা নূর আলমসহ জন্মভূমি বাংলাদেশে ফেরৎ পাঠাবে।