লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক ধ্বনিতে পাপমুক্তি ও আল্লাহর খাস রহমতের আশায় লাখ লাখ মুসল্লির চোখের জলে সিক্ত হয়েছে আরাফাতের ময়দান। দু’হাত তুলে এক সঙ্গে প্রায় ২৫ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান ইহকাল ও পরকালের কল্যাণের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বে শান্তি ও সমৃদ্ধি জন্য কামনা করেছেন। বৃহস্পতিবার দিনভর আরাফাতে অবস্থানের মাধ্যমেই সম্পন্ন হলো পবিত্র হজ। বুখারী মুসলিম শরীফে রয়েছে মকবুল হজের প্রতিদান একমাত্র জান্নাত।
আরাফাতের ময়দান থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হজ টাস্কফোর্সপ্রধান জয়নাল আবেদীন তালুকদার জনকণ্ঠকে বলেন, আল্লাহর অশেষ রহমতে ভালভাবেই সম্পন্ন হলো বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৭৫টি দেশের মুসলমানদের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত এবাদত হজ। এর মধ্যে বাংলাদেশের ১ লাখ ১১ হাজার ২৭৯ জন হজ পালনের সৌভাগ্য অর্জন করেন। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে এত বিপুলসংখ্যক হজযাত্রীর কণ্ঠে ছিল দোয়া-মোনাজাত-জিকির। মসজিদে নামিরার খতিব খুতবা পাঠের সময় সমস্ত হাজীই ছিলেন আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন। তাঁরা নিজ নিজ খিমায় বসে দিনভর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় ক্ষণিকের জন্য ভুলে গিয়েছিলেন দুনিয়াদারির ক্ষণস্থায়ী জীবনের মায়া।
আদিপিতা হজরত আদম (আ) ও আদিমাতা বিবি হাওয়ার (আ) মিলিত হওয়ার এবং নবীকুল শিরোমণি হজরত মুহম্মদের (স) বিদায় হজের ভাষণের সেই ঐতিহাসিক স্থান আরাফাত ময়দানে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা পাপমুক্তি ও আত্মশুদ্ধির আকুল বাসনা নিয়ে বৃহস্পতিবার সারাদিন হজের মূল কাজ সম্পন্ন করেন। সেলাইবিহীন সাদা দুই খ- কাপড় (ইহরাম) পরিধান করে সমস্ত হাজী আরাফাতে জমায়েত হন। এ সময় তাঁদের মানসপটে ভেসে ওঠে দেড় হাজার বছর আগে বিদায় হজের ভাষণের সেই ঐতিহাসিক চিত্র।
বৃহস্পতিবারও সমস্ত হজযাত্রী তাঁবু টানিয়ে, খোলা আকাশের নিচে মাথায় ছাতা ধরে দেশ-জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে এক কাতারে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে অন্তত একটি দিনের জন্য হলেও ইসলামের নীতি-আদর্শকে সমুন্নত রেখেছেন, যা বিপথগামী মুসলমানের জন্য পাথেয় হতে পারে।
আরাফাতের ময়দান থেকে জয়নুল আবেদীন তালুকদার জনকণ্ঠকে বলেন, এ বছর হজের খুতবা পাঠ করেন সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি আব্দুল আজিজ আল শাইখ। সৌদির স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে শুরু হয়ে ৪০ মিনিট চলে। দৃষ্টিশক্তিহীন এ ইমাম তুলে ধরেন বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি ও কোরান হাদিসের আলোকে করণীয় দিকনির্দেশনা। মসজিদে নামিরা থেকে খুতবার শব্দ গোটা আরাফাতে শোনা না গেলেও মুসল্লিরা রেডিও এবং টিভির মাধ্যমে শুনেছেন গুরুত্বপূর্ণ এ খুতবা। তিনি খুতবায় সারা জাহানের মুসলিম উম্মাহর শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন। এ ছাড়া আরব বিশ্বের সমস্ত মুসলমানের ঐক্য ও সংহতির গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে মুফতি আব্দুল আজিজ আল শাইখ বলেন, দুনিয়ায় ফেতনা সৃষ্টিকারী ও শান্তি বিনষ্টকারীরা পরকালে অবশ্যই শাস্তি পাবে। আল্লাহ ও রাসুলের তরিকায় উদ্বুদ্ধ হয়ে হিংসাবিদ্বেষ ভুলে গিয়ে মানুষের কল্যাণে ব্রত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, শান্তিুর ধর্ম ইসলাম। এ ধর্মে বিশ্বাসীদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ থাকতে পারে না । বর্তমান বিশ্বের সমস্ত মুসলমানের ওপর অত্যাচারীদের হেদায়েত করার জন্য আল্লাহর খাস রহমত কামনা করেন। আরর বিশ্বের বর্তমান সহিংসতার কথা উল্লেখ করে তিনি পশ্চিমা শক্তিকে হীনরাজনীতি থেকে বিরত থাকা ও সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
বৃহস্পতিবার দুপুরে খুতবার পর জোহর ও আছরের নামাজ আদায় করেন হাজীরা। তাঁরা সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে পাঁচ কিলোমিটার দূরের মুজদালিফায় গিয়ে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায়ের নিয়তে রওনা হন। রাতে সেখানে অবস্থান করেন খোলা মাঠে। শয়তানকে নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় পাথর সংগ্রহ করেন এখানেই।
আজ শুক্রবার মুজদালিফায় ফজরের নামাজ আদায় করে হাজীদের কেউ ট্রেনে, কেউ গাড়িতে, কেউ হেঁটে মিনায় যাবেন এবং নিজ নিজ তাঁবুতে ফিরবেন। মিনায় বড় শয়তানের উদ্দেশে সাতটি পাথর মারার পর পশু কোরবানি দিয়ে মাথার চুল ছেঁটে (মাথা ন্যাড়া করে) গোসল করবেন। সেলাইবিহীন দুই টুকরো কাপড় বদল করবেন। এরপর স্বাভাবিক পোশাক পরে মীনা থেকে মক্কায় গিয়ে কাবা শরীফ সাতবার তাওয়াফ করবেন। কাবা শরীফের সামনের দুই পাহাড় সাফা ও মারওয়ায় ‘সাঈ’ (সাতবার দৌড়াবেন) করবেন। সেখান থেকে তাঁরা আবার মীনায় যাবেন। মিনায় আরও এক বা দুই দিন অবস্থান করে হজের অন্য আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করবেন। এরপর আবার মক্কায় ফিরে বিদায়ী তাওয়াফ করবেন। আগে যাঁরা মদীনায় যাননি, তাঁরা বিদায়ী তাওয়াফের পর মদীনায় যাবেন। যাঁরা আগে মদীনায় গেছেন, তাঁরা নিজ নিজ দেশে ফিরবেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশন ছাড়াও বেশ কটি স্যাটেলাইট চ্যানেল সৌদিয়া টেলিভিশনের কল্যাণে আরাফাতের ময়দান থেকে খুতবা ও দোয়া সরাসরি সম্প্রচার করে। এতে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ কোটি কোটি মানুষ আরাফাতের হজের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান।
জানা যায়, এবার আরাফাতের ময়দানে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে আধুনিক ব্যবস্থাপনায় হজের সামগ্রিক কর্মকা- তদারকি করা হয়েছে। বাংলাদেশের হাজীদের সবাইকে একটি নির্দিষ্ট চিহ্নিত স্থানের খিমায় রাখার আয়োজন করা হয়। সেখান থেকে অনেকেই আখেরি মোনাজাত মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নিজ নিজ স্বজনদের কাছে সরাসরি সম্প্রচার করেছে। এতে বাংলাদেশে অবস্থান করেও অনেকে মোনাজাতে অংশ নেয় বলে জানা যায়।
সৌদি হজ মন্ত্রণালয় ও মোয়াচ্ছাসা কার্যালয় সূত্র জানায়, মক্কা, মীনা ও আরাফাতের ময়দানে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে সব হাজীকে বিনা মূল্যে খাবার, বিশুদ্ধ পানিসহ সব সুবিধা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারী সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান হাজীদের নানা উপহার দিচ্ছে।
জেদ্দার চেম্বার অব কমার্স ও মক্কার কেন্দ্রীয় পরিবহনের সভাপতি আলী হাসান নাকর জানান, এবার ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, তুরস্ক ও মিসর থেকে সবচেয়ে বেশি হাজী এসেছেন।
পবিত্র হজ পালন করতে এসে এ পর্যন্ত ৬০ বাংলাদেশীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। জয়নাল আবেদীন তালুকদার বলেন, বাংলাদেশের সব হাজী সুস্থ আছেন। হজ মিশনের নিয়ন্ত্রণকক্ষে হজযাত্রীদের সার্বিক বিষয়ে দেখভাল করা হয়। মীনায় ২৫-৬২ নম্ব^র তাঁবুতে বাংলাদেশ হজ মিশনের কার্যক্রম চলবে হজের পাঁচ দিন।