এটি আশির দশক, ১৯৮৬ সাল।আমি তখন চাকরীসূত্রে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম নানা কারণে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে এ সময়টিতে আমি বেশ লিখতে পেরেছি। কবিতা, গল্প এমনকি উপন্যাসও।
ঢাকার জাতীয় দৈনিকগুলো নিয়মিত লেখাগুলো ছাপছে। তখন অবশ্য এখনকার মতো এতো দৈনিকের আধিক্য না থাকলেও বেশ কিছু নতুন দৈনিক পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত দৈনিকের সাথে যোগ হয়েছে। পুরনো ও নতুন সব কাগজেই তখন বলতে গেলে উৎসাহের সাথে লিখছি। সাপ্তাহিকের মধ্যে তখন বিচিত্রা, রোববার ও সচিত্র সন্ধানীতেও লিখে ধন্য হচ্ছি। তবে তখন একটি কাগজ এসব কিছুকে ছাড়িয়ে সূধী পাঠকের ঘরে ঘরে ঠাঁই করে নিয়েছে। আর সে কাগজটি হলো কলকাতা থেকে প্রকাশিত "সাপ্তাহিক দেশ"। এর সাহিত্য অসাধারণ। কি কবিতা, কি গল্প, কি উপন্যাস, কি প্রবন্ধ। সব কিছুই বাছাই করা। তখন উপন্যাস লিখছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, সমরেশ বসু, সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, আবুল বাশার, বাণি বসু প্রমুখরা। কবিতা লিখছেন অরুণ মিত্র, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শঙ্খ্ব ঘোষ, শক্তি চট্টপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গপাধ্যায় সহ বাংলাদেশের শামসুর রাহমান, বেলাল চৌধুরী, রফিক আজাদ কখনো কখনো সৈয়দ শামসুল হক। তরুনদের কবিতাও ছাপা হয় তবে বেশিরভাগ পশ্চিমবঙ্গের। এ সময় অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর অনেকটা সাহস করেই দুটো কবিতা পাঠিয়ে দিলাম দেশ-এর ঠিকানায়। ছাপা হবে না এরকম ভেবে নিয়েই। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে লেখা পাঠানোর তিন সপ্তাহ পর আমার কবিতা "এখনো স্মৃতির ভেতর" ছাপা হলো ৩০ আগষ্ট ১৯৮৬ সংখ্যায়। এ সংখ্যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস পূর্ব-পশ্চিম ও সমরেশ মজুমদারের " গর্ভধারিণী"র ধারাবাহিক অংশও ছিল। বাংলাদেশের এক অখ্যাত কবির( সুনীলদার কাছে যার মোটেই পরিচিতি নেই) কবিতা সেসময় ছেপে তাকে বিস্মিত ও পূলকিত করেছিলেন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে অবশ্য আমার দেখা করার সৌভাগ্য হয়নি। যদিও তিনি একাধিকবার বাংলাদেশে এসেছিলেন। তাঁর সাথে দেখা হলো আমেরিকায়, নিউইয়র্কে ২০০৯ সালে। এবিসি সম্মেলনে। কবি ফকির ইলিয়াসের সৌজন্যে। এবিসি সম্মেলনের একটি পর্ব ছিল অভিবাসী সাহিত্য নিয়ে। কবি ফকির ইলিয়াসের ধারণা হলো এ বিষয়ে আমার বলা দরকার।অনুষ্ঠানটির উপস্থাপকও তিনি ছিলেন। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অথিতি ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিশেষ অতিথি সমরেশ মজুমদার, পদ্মা নদীর মাঝিখ্যাত গৌতম ঘোষ, দিলারা হাশেম প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছিলেন ফেরদৌস সাজেদীন। আমার আলোচনার রেশ ধরে সুনীলদা কয়েকবার কবি তমিজ উদদদীন লোদী উচ্চারণ করে বক্তব্য রাখলেন। অনুষ্ঠান শেষে আমি বললাম,'সুনীলদা আপনি কি আমাকে চেনেন?' তিনি বললেন,'তোমাকে দেখিনি তো এর আগে তবে তোমার নামটি আমার মনে আছে, এর একটি কারণ দুই বাংলায় সম্ভবত তুমিই একমাত্র লোদী নামদারি কবি। লোদী নামদারী আর কোনো কবির কথা আমি অন্তত জানি না।'
এরপর সুনীলদার সাথে একাধিকবার আড্ডা ও কথা বলার সুযোগ ঘটেছে। সর্বশেষ তার সাথে দেখা হয়েছে ২০১১ সালে, মুক্তধারার বইমেলার কবিতা পাঠের আসরে।সেই অনুষ্ঠানটি পরিচালনার সৌভগ্য হয়েছিল আমার। সেদিন শ্রোতার আসরে বসেছিলেন তিন দিকপাল কবি সৈয়দ শামসুল হক, কবি শহীদ কাদরী ও কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। পরে আয়োজন করা হয়েছিল এই তিন কবির স্বকণ্ঠে তাদের কবিতা পাঠের আসর। এই বিরল সৌভাগ্য হয়েছিল আমাদের। এটি বিরল হয়েই রইল। এই তিন কবির একত্রে কবিতা পাঠ আর কখনো সম্ভব হবে না। সুনীলদা আপনি যেখানে থাকুন, ভালো থাকুন।
নিউইয়র্ক,যুক্তরাষ্ট্র