লড়াইটা হাড্ডাহাড্ডি হলেও জয় ওবামারই হবে। এ ধারণা নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের প্রায় সবার। যার সঙ্গেই কথা হয়েছে তিনিই এ মত দিয়েছেন। অনেকেই বলছেন, কোনো যুক্তি ছাড়া, স্রেফ ভালোবাসা বা পছন্দের টানে।
তবে নিউইয়র্কে যেসব বাঙালি যথেষ্ট বিচার বিশ্লেষণ করে তাদের মতামত জানিয়েছেন, তারা বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাদের হিসেবে ওবামা দ্বিতীয় দফাতেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন। তবে প্রত্যেকেই সোমবার রাতের বিতর্কের পরই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত ধারণা করা যাবে বলে মনে করছেন। নির্বাচনে প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে ওহাইও, ফ্লোরিডা, আইওয়া, নিউ হ্যাম্পশায়ার, পেনসিলভ্যানিয়া অঙ্গরাজ্যকে চিহ্নিত করছেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশি জনপ্রিয় কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান ফেরদৌসের মতে, ইলেক্টোরাল কলেজ ম্যাপে দেখা যাচ্ছে ওবামাই এগিয়ে। এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে তিনটি প্রধান ইস্যু: অভিবাসন, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান। বাংলাদেশি বা বাঙালি যারা যুক্তরাষ্ট্রে আছেন তাদের জন্য এই তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
Hasan-Ferdousহাসান ফেরদৌস বলেন, “ভোটাররা কতটা ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন সেটি গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ৫০ শতাংশের কিছু বেশি ভোট কাস্ট হয়। আর অভিবাসীদের মধ্যে ভোট দেওয়ার প্রবণতা আরও কম।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারে অভিবাসীরা বেশি হারে ভোট দিতে সেন্টারগুলোতে যাবেন। তাতে ওবামার জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। কারণ, ডেমোক্র্যাটদের অভিবাসন নীতি অনেক বেশি উদার।
হাসান ফেরদৌস আরো বলেন, “ইমিগ্রেশনে যে ব্যাপক সংস্কারের (কম্প্রিহেনসিভ রিফর্ম) কথা বলা হচ্ছে তা ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান কোনো দলই করবে না। অ্যামনেস্টি হয়তো কখনোই দেবে না। কিন্তু তারপরেও ডেমোক্র্যাটরা ইমিগ্রেশনের পক্ষে উদারনীতির চর্চা করে। আর সে কারণেই দক্ষিণ এশিয়ান জোন থেকে আসা মানুষগুলো ডেমোক্র্যাটদের পক্ষেই থাকবেন।”
যুক্তরাষ্ট্রে এবারের নির্বাচনে নারী ভোটাররাই হবেন প্রধান নিয়ামক। নারীরা যাকে বেশি ভোট দেবেন তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন- এই মত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সরাসরি সম্পৃক্ত বাংলাদেশি মোরশেদ আলম বলেন, “নারীদের ভোট ওবামার পক্ষেই বেশি যাবে। কাজেই তার জয় হবে। তবে এই জয় হবে মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশের ব্যবধানে।”
Morshed-Alamনারীদের ভোট কিছুটা মিট রমনিও টানবেন বলে মনে করছেন মোরশেদ। ডেমোক্র্যাট দলের হয়ে নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটে নির্বাচন করে রেকর্ড সংখ্যক ভোট পান মোরশেদ আলম। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় বাংলাদেশি বলে পরিচিতি রয়েছে তার। তিনি বলেন, “নির্বাচনটিকে এতোটা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের দিকে নিয়ে গেছে প্রথম বিতর্কে বারাক ওবামার দুর্বল পারফরম্যান্স। দ্বিতীয় বিতর্কে তিনি কিছুটা ফাইট ব্যাক করলেও তা এখনো তাকে কোনো শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারেনি। আর সে কারণে সোমবারের তৃতীয় বিতর্কের দিকেই এখন সবার চোখ। সোমবার রাতেই হয়তো নির্ধারিত হয়ে যাবে যে ২-৩ শতাংশ মার্জিন অব এরর নিয়ে ওবামা এগিয়ে রয়েছেন তা ধরে রাখতে পারবেন কি না।”
মিডিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সব সময়ই রাখে; এবারও রাখছে- বলেন মোরশেদ আলম। তিনি বলেন, “ফক্স নিউজ রিপাবলিকানদের নিজস্ব মিডিয়া। কিন্তু সিএনএন এর ভূমিকা কিছুটা উদ্বেগের। এই চ্যানেলটিও কিছুটা রিপাবলিকানদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে রিপোর্টিং ও বিশ্লেষণ করছে। মোরশেদ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষের মুড সকাল-বিকেল পাল্টায়। পুরোটাই নির্ভর করে তাদের মুডের ওপর। এ কারণেই বিতর্কে ওবামা দেশবাসীর মন জয় করে নিতে পারলে তার জয় অনিবার্য হবে।”
আরও একটি বিষয়ে জোর দেন মোরশেদ আলম। তিনি বলেন, “ছাত্র, উচ্চশিক্ষিত ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গেলে ওবামাই জিতবেন।”
‘ওবামা ডিজার্ভস উইনিং দ্য ইলেকশন’ এই মত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউটিসি অ্যাসোসিয়েট ইনকরপোরেটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও চেয়ারম্যন আজিজ আহমেদের। তিনি বলেন, “ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী স্ট্র্যাটেজি নিখুঁত এবং জয় অবশ্যই হবে। ওবামা এই জয় পাবেন কারণ তিনি একটি ডিজাস্ট্যারাস (বিপর্যয়কর) অবস্থা থেকে অর্থনীতিকে শক্ত অবস্থানের দিকে নিয়ে যেতে পারছেন। গোটা দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ওবামা গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছেন এবং তার সময়ে ৮ শতাংশ কাজের সুযোগ বেড়েছে। ওবামার নেওয়া মেডিকেয়ারের সুবিধাভোগী মানুষের সংখ্যা ৪৭ শতাংশ। তারা ওবামাকেই ভোট দেবেন।”
Aziz-Ahmadওহাইও, ফ্লোরিডা, পেনসিলভ্যানিয়াতে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “ওহাইওতে এখন অনেকটাই এগিয়ে আছেন ওবামা।” তবে সোমবারের বিতর্ক থেকে বিষয়টি অনেকাংশে স্পষ্ট হয়ে যাবে- একথা জানালেন যুক্তরাষ্ট্র-প্রবাসী এই বাংলাদেশি ব্যবসায়ীও। এছাড়া মিট রমনি তার কট্টর রক্ষণশীল মনোভাবের কারণে এবং সামরিক শক্তিকেই বড় করে দেখার কারণে পিছিয়ে থাকবেন বলে মত দেন আজিজ আহমেদ।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম মাফ মিজবাহ উদ্দিন। নিউইয়র্ক সিটি অ্যাকাউন্ট্যান্টস অ্যান্ড অ্যাকচ্যুয়ারিজ ইউনিয়নের সভাপতি মিজবাহ বলেন, “নির্বাচনে ওবামাই জয়ী হবেন।” কেন জয়ী হবেন তার পক্ষে যুক্তি হিসেবে মাফ মিজবাহ বলেন, “প্রথমতঃ ওবামার সমকাজে সম-মজুরি নীতির বাস্তবায়ন তাকে জিতিয়ে দেবে। দেশের একটি বৃহৎ অংশ তার এই নীতির সুবিধাভোগী। দ্বিতীয়তঃ ওবামা-কেয়ার অর্থাৎ ওবামার নেওয়া হেলথ কেয়ার কর্মসূচি। এই কর্মসূচিকে ১৯৫০ এর পর সবচেয়ে সেরা আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি বলে মত দেন মাফ মেসবাহ।
ক্ষমতা গ্রহণের পর ৪ কোটি ৭০ লাখ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করাকে প্রথম কাজ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন ওবামা। তাদের মধ্যে ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষকে এরই মধ্যে তিনি বীমা সুবিধার আওতায় আনতে পেরেছেন। এটা একটি বড় অর্জন- বলেন মিজবাহ।
তৃতীয়তঃ অভিবাসন ব্যবস্থার সংস্কার। একটি সমন্বিত অভিবাসন সংস্কার ওবামার প্রতিশ্রুতি। পুরোপুরি সম্ভব না হলেও এদের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় থাকা শ্রেণীটিকে সহযোগিতা দিতে পেরেছেন তিনি। এবং দ্বিতীয় দফায় নির্বাচিত হয়ে বাকি কাজটিও শেষ করতে পারবেন। ফলে এই সুবিধাভোগীরা ওবামাকেই ভোট দেবেন বলে বিশ্বাস মাফ মিজবাহ উদ্দিনের।
তার মতে চতূর্থ বিষয়টি হচ্ছে- ওবামার প্রণীত এমপ্লয়িজ ফ্রি চয়েস অ্যাক্ট। এটি কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মীকে ইউনিয়নভুক্ত হতে সহযোগিতা দিচ্ছে। যার ফলে ৬০ শতাংশ আমেরিকান শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন করার সুযোগ পাচ্ছেন। যা তাদের কাজ, অবসরভাতা, স্বাস্থ্যবীমা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
Maf-misbah`জনগণের (পপুলার) ভোটে জিতেও কখনো ইলেক্টোরাল কলেজে হেরে যাওয়ার আশংকা থেকেই যায়`--এ প্রসঙ্গে মাফ মিজবাহ উদ্দিন বলেন, “এবারের নির্বাচনে তেমনটি হবে না। কারণ, এ পর্যন্ত হিসাবে ওবামার পক্ষে যাবে ২৩১টি ইলেক্টোরাল কলেজ, যেখানে রমনি পাবেন ১৯১টি।”
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় যুক্তরাষ্ট্র-প্রবাসী সাবেক কূটনীতিক আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতিসংঘে কর্মরত থেকে দেশের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাপালনকারী এই বাংলাদেশি বলেন, “নির্বাচনে ওবামার জয়ের সম্ভাবনাই বেশি।” অভিবাসী, শিক্ষিত প্রগতিশীল ও নারীদের ভোট ওবামার পক্ষে যাবে বলেই তার ধারণা। তবে তারও মতে বিতর্কে ওবামার শক্ত অবস্থান না থাকা তাকে একটি প্রতিযোগিতাপূর্ণ অবস্থানের দিকে নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, “সোমবার অনুষ্ঠেয় তৃতীয় বিতর্কের দিকেই সবার চোখ।”
একজন ভালো বক্তা হিসেবে ওবামার যে খ্যাতি রয়েছে তার প্রতি সুবিচার করে তৃতীয় বিতর্কে তার জয় হবে এই প্রত্যাশার কথা-ই জানালেন আবদুর রাজ্জাক।