|
|
| মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য ২৬ বিদেশিকে সম্মাননা দেবে সরকার |
|
|
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখায় ২৬ বিদেশি নাগরিককে সম্মাননা জানাবে সরকার। এরই মধ্যে তাদের একটি তালিকা তৈরি করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। আগামী ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে এ তালিকার প্রথম সারির কয়েকজনকে সম্মাননা দেয়া হবে। বাকিদের আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে সম্মাননা দেয়া হবে। বিদেশি এসব নাগরিকের মধ্যে যারা মারা গেছেন, তাদের পরিবারকে এই অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেয়া হবে। বিদেশি এসব নাগরিকের সম্মাননা দেয়ার ব্যাপারে অনুমোদন চেয়ে একটি প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রিসভায় পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রীসভায় অনুমোদন পাওয়ার পর তাদের আমন্ত্রণ জানানো শুরু করা হবে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী বিদেশি নাগরিকদের সংবর্ধনা জানানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে সময় কিছু সমস্যা দেখা দেয়ায় তাদের সংবর্ধনা দেয়া হয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার তাদের সংবর্ধনা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। তবে তালিকাভুক্ত সবাইকে এবার ২৬ মার্চ অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেয়া হবে না। এদের মধ্যে প্রথম সারির কয়েকজনকে সংবর্ধনা দেয়া হবে। বাকিদের পর্যায়ক্রমে দেয়া হবে।
জানা গেছে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রত্যক্ষভাবে ভারতের সহযোগিতা ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও দেশের নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষে নানাভাবে সমর্থনদানসহ সহযোগিতা দিয়েছিলেন। সংবর্ধনা জানাতে ২৬ জনের যে তালিকা তৈরি করা হয়েছে এদের মধ্যে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, কনসার্ট ফর বাংলাদেশের নায়ক জর্জ হ্যারিসন, প্রখ্যাত সিতারবাদক পণ্ডিত রবি শঙ্কর, ভারতের সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মানেকশ, ভারতের তত্কালীন সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডার চিফ অব স্টাফ লে. জেনারেল জেএফআর জেকব, যৌথ বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ লে. জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরাকে আগামী ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেয়া হবে। যারা বেঁচে আছেন তাদের পাশাপাশি যারা মারা গেছেন তাদের পরিবারকে সংবর্ধনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বাকি ২০ জনকে আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেয়া হবে। এদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি, লন্ডনে ভারতীয় সাবেক রাষ্টদূত আপাপান্থ, পাকিস্তানের সাবেক বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল আজগর খান, সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী আলেক্সী কেসিগান, ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভেট, যুক্তরাষ্ট্রের একজন সাধারণ নাগরিক রিচার্ড টেইলর, পাকিস্তানের কবি ও সাংবাদিক আহমেদ সালিম, সোভিয়েত নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা অ্যাডমিরাল জুয়েনকো, নেপালের প্রেসিডেন্ট রাম বরণ জাদব, ভারতের নাগিরক লতা মুঙ্গেশকর, সলিল চৌধুরী, গোবিন্দ হালদার ও মুম্বাইয়ের তত্কালীন প্রথম সারির নায়িকা ওয়াহিদা রহমান।
জানা গেছে, এসব খ্যাতিমান ব্যক্তির মধ্যে জর্জ হ্যারিসন মারা গেছেন ২০০২ সালে। এখন তার পরিবারকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। তিনি সে সময় নিউইয়র্কের মেডিসন স্কয়ারে দুই দফায় কনসার্ট করে টিকিট বিক্রির ১ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ টাকা বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের জন্য দিয়েছিলেন। রবি শঙ্কর অবশ্য এ কৃতিত্বের বড় দাবিদার। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে ভেটো না দিলে এবং ভারতকে সমর্থন না জানালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন অনেকটা কঠিন হয়ে যেত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন নিক্সন সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতা করলেও বহু আমেরিকান ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির ভাই অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি। তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী শিবিরে এসে বাংলাদেশের মানুষের নির্মম কাহিনী বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছিলেন। সে সময় তিনি দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। যুদ্ধের পর বিধ্বস্ত বাংলাদেশ দেখতে অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি ঢাকায় আসেন এবং কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন মাঠে জনসমাবেশে বক্তৃতা করেন। ভারতের প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী লতা মুঙ্গেশকর ১ লাখ রুপি অনুদান দিয়েছিলেন। চিত্রনায়িকা ওয়াহিদা রহমান তার এক বছরের চুক্তিতে নেয়া ছবির পুরো টাকা শরণার্থী শিবিরের জন্য দিয়েছিলেন। যুক্তরাস্ট্রের একজন সাধারণ নাগরিকের নাম রিচার্ড টেইলর, যিনি ওই সময় তার লোকজন নিয়ে বকেড তৈরি করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র চালান পাঠানো প্রতিরোধ করেছিলেন। এ মানুষটি এখনও বাংলাদেশের কাছ থেকে স্বীকৃতি পেতে বেঁচে আছেন। খোদ পাকিস্তানের নাগরিক হয়েও সে সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে এবং পাকিস্তানের নারকীয় হামলার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন সাংবাদিক আহমেদ সালিম। এজন্য তাকে জেল খাটতে হয়েছিল। একই কারণে পাকিস্তানের সাবেক বিমান বাহিনীর প্রধান আজগর খানকেও নানা হয়রানি ও দুর্ভোগ পোহাতে হয়। নেপালের বর্তমানে প্রেসিডেন্ট রাম জাদব সে সময় মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন। ছাত্র অবস্থায় তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আর্থিক সহযোগিতা দিতে অর্থ সংগ্রহ করে পাঠিয়েছিলেন।
এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মুক্তিযুদ্ধে সমর্থনকারী বিদেশি নাগরিকদের সংবর্ধনা জানাতে এরই মধ্যে প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। তাদের কীভাবে সংবর্ধনা দেয়া হবে সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা চেয়ে একটি প্রস্তাব গত সপ্তাহে মন্ত্রিসভায় পাঠানো হয়েছে। এই প্রস্তাব অনুমোদন পাওয়ার পর বাকি কাজ শুরু করা হবে।
|
| |
|
|